আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপে ফের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। বৃহস্পতিবার আঘাত হানা এই ভূকম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৯। ভূগর্ভস্থ তথ্য পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, ভূকম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। স্বল্প গভীরতার এই ভূকম্পন দ্বীপজুড়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের আঘাতে বিপর্যস্ত এই অঞ্চলে নতুন করে কম্পন অনুভূত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
চলতি সপ্তাহে ফ্লোরেস অঞ্চলে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা। এর আগে গত সোমবার একই তীব্রতার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যার উৎপত্তিস্থলও ছিল ভূত্বকের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ধারাবাহিক এই ভূকম্পন এমন এক সময়ে আঘাত হানল, যখন অঞ্চলটি মাত্র কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। গত শনিবার সংঘটিত ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ফ্লোরেস অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে এবং অন্তত ৫৩ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শনিবারের সেই বিপর্যয়ের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার এবং নিখোঁজদের সন্ধানে যখন উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই পরবর্তী আফটারশক ও নতুন ভূকম্পন উদ্ধারকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, একের পর এক শক্তিশালী কম্পনের ফলে পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের সার্বিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো প্রদেশে এখন পর্যন্ত নয় শতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অন্তত সাড়ে চার শত ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ফ্লোরেস দ্বীপেই দুই শতাধিক ঘরবাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩৫ জন বাসিন্দা, যাদের স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্র ও অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ধারাবাহিক কম্পনের কারণে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ বাসস্থান ছেড়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলোর পরিচালিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
সর্বশেষ ভূকম্পনের পরপরই উপকূলীয় এলাকায় সম্ভাব্য সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সতর্কবার্তা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলবর্তী এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে তুলনামূলক উঁচু স্থানে অবস্থান নেন। যদিও পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণ শেষে সুনামির আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি না থাকায় সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তবুও আফটারশকের আশঙ্কায় অনেকেই এখনও নিজ বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ মানুষ খোলা আকাশের নিচে অথবা ত্রিপল টানিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।
বিপর্যস্ত দুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা চলমান রয়েছে। উদ্ধারকারী ও ত্রাণকর্মীরা গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের মধ্যে জরুরি খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল, প্রস্তুতকৃত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, কম্বল, তাবু এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ সরবরাহ করছেন। একই সঙ্গে রোগব্যাধি সংক্রমণ রোধে স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে পাহাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ভূকম্পনজনিত ভূমিধসের কারণে কিছু এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ইন্দোনেশিয়া অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বা টেকটনিক প্লেটের অত্যন্ত সক্রিয় সীমানায় অবস্থিত। এখানে একাধিক ভূ-প্রাকৃতিক প্লেটের নিয়মিত সংঘর্ষ ঘটে থাকে, যার ফলে প্রায়শই তীব্র ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। ফ্লোরেস অঞ্চলের বর্তমান ধারাবাহিক ভূকম্পন এই সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামোরই অংশ। ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, প্রধান ভূমিকম্পের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এ ধরনের আফটারশক বা মাঝারি মাত্রার কম্পন অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামোগুলো আরও ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।