রাজধানী ডেস্ক
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নারীবান্ধব করতে ২০০টি নতুন বৈদ্যুতিক বাস (ইভি বাস) কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ১০০টি বাস নির্ধারিত বিভিন্ন রুটে নারী যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ থাকবে। দ্রুততম সময়ে সেবা চালু করতে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় এসব বাস সংগ্রহ করা হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) আয়োজিত ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস সংগ্রহ করতে গেলে অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে অন্তত দেড় বছর সময় লেগে যায়। নাগরিকদের দ্রুত স্বস্তি দেওয়া এবং রাজধানীতে দ্রুত পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর স্বার্থেই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঢাকায় একটি সমন্বিত মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে এই বৈদ্যুতিক বাসগুলো বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে।
নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০০টি বৈদ্যুতিক বাসের মধ্যে ১০০টি সরাসরি নারীদের জন্য পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে নগরীতে নারী যাত্রীদের বাসসেবার পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বর্তমানে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে বিশেষায়িত নারীবান্ধব বাসসেবা চালু করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশের সব বিভাগীয় শহরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্বোধনী কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে তিনটি অঞ্চলে ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বিশেষ বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ১০টি রুটে ১০টি বাস চলাচল করবে, যার মধ্যে ৯টি দ্বিতল ও একটি একতলা বাস। এ ছাড়া চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করবে।
অনুষ্ঠানে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তাজনিত পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, নারী যাত্রীদের শুধু বাসে ওঠার পরই নয়, বরং বাসের জন্য অপেক্ষমাণ থাকা এবং গন্তব্যে নামার প্রতিটি ধাপে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবহন ব্যবস্থায় ওঠা-নামার সময় যেকোনো প্রকার অস্বস্তি বা নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অংশ নারী এবং জাতীয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্র গঠনে তাঁদের অবদান অপরিসীম। নারীরা যেন তাঁদের পূর্ণ সক্ষমতা সমাজ ও অর্থনীতির কল্যাণে কাজে লাগাতে পারেন, সে জন্য তাঁদের চলাচলকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বর্তমান পরিচালন পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সংস্থাটির বহরে প্রায় ১ হাজার ২০০টির মতো বাস রয়েছে, যার মধ্যে ৫০০টির বেশি বাস সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থাটি দীর্ঘদিনের আর্থিক লোকসান কাটিয়ে বর্তমানে ব্রেক-ইভেন বা লাভ-ক্ষতিহীন অবস্থায় পৌঁছাতে পেরেছে। তবে সেবার কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করতে সংস্থাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন পদ্ধতি এবং গ্রাহক সেবার মানে আরও আমূল সংস্কার ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালু হয়ে পরবর্তীতে তদারকির অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার নজির তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগটি যেন কেবল উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেবা চালুর পর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত নজরদারি বজায় রেখে সেবার মান দিনে দিনে আরও উন্নত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই সার্ভিস ধরে রাখা, টেকসই করা এবং পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তৃত করাই মূল চ্যালেঞ্জ, যা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একযোগে কাজ করবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় ও বিআরটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।