অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর স্বনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি ব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও পরিহার কঠোরভাবে রোধ এবং রাজস্ব প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।
বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, রাজস্ব সম্মেলন কেবল বার্ষিক আদায়ের হিসাব-নিকাশের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার কৌশল নির্ধারণে এ সম্মেলন নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করবে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে অত্যন্ত নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতকে চিহ্নিত করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত আরও হ্রাস পেয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এ হার বর্তমান বিশ্বে অন্যতম নিম্নতম স্তর হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
জাতীয় অর্থনীতির সম্প্রসারণ হলেও রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ব্যবধান দূর করতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো কোনো যৌক্তিক সমাধান নয়। বরং করজালের বাইরে থাকা সক্ষম নাগরিকদের করের আওতায় আনা, বিদ্যমান কর অব্যাহতির ক্ষেত্রগুলো পুনর্মূল্যায়ন ও যৌক্তিক করা, এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে কর ফাঁকি ও পরিহার বন্ধ করাই সরকারের প্রধান কৌশল। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের নিয়মিত কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া সংস্কার পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি জানান, ঐতিহ্যবাহী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠন করে দুটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত বিভাগে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর একটি অংশ ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ হিসেবে কর সংক্রান্ত আইন, নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করবে এবং অন্য অংশ ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কর আদায়, বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ বিভাজনের ফলে রাজস্ব নীতি ও প্রয়োগের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত দূর হবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি ছাড়া স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতের বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা কঠিন। ফলে রাজস্ব নীতি ও আদায় কাঠামোর এই দ্বৈত রূপান্তর বাস্তবায়িত হলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর জাতীয় বাজেটের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।