অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রাজস্ব প্রশাসনকে আধুনিক ও কার্যকর করতে বিদ্যমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাজস্ব সংক্রান্ত দায়িত্ব দুটি পৃথক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হবে। এর একটি হবে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ এবং অপরটি ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’। রাজস্ব নীতি বিভাগ সরকারের বিশেষজ্ঞ ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। এই সংস্থা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ‘অ্যাকশন টিম’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কর আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও সে অনুযায়ী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। এই ঘাটতি পূরণে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর বদলে করের আওতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও পরিহার রোধ এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে কর পরিপালন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের রূপরেখা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রাকে কৌশলগতভাবে উচ্চাভিলাষী হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, সরকার দেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে বিনিয়োগনির্ভর ও স্বনির্ভর অর্থনীতির দিকে নিয়ে যেতে চায়। জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিজস্ব সম্পদ থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের সামগ্রিক রাজস্ব সংস্কার কার্যক্রমে আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারি—এই তিন ভিত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। রাজস্ব প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় বা ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সংযোগ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারের মূল লক্ষ্য একটি সম্পূর্ণ ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ও ‘ফেসলেস’ রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার মতো ব্যবসাবান্ধব ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের বিষয়টিও সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম সর্বনিম্ন। যেখানে ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের অনুপাত ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজস্ব সম্মেলনকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবের মঞ্চ নয়, বরং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জাতীয় ঐকমত্য তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার বলে জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।