আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে অব্যাহত হুমকি প্রদানের বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে এই কড়া বার্তা দেন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান বাকযুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এই কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামনে এলো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে ইব্রাহিম আজিজি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ধারাবাহিক হুমকি প্রদান থেকে ওয়াশিংটনের সরে আসা উচিত। ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার চেয়ে নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক হওয়াই তাঁর জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে আত্মরক্ষার জন্য খাদ্য পরিবহনকারী ট্রাকে আশ্রয় খোঁজার মতো সংকটে পড়তে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। আজিজির এই বিবৃতি ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে তেহরানের কঠোর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে চরম অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রণালিটি বর্তমানে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ও জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ রয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ ও অযাচিত উপস্থিতি স্থায়ীভাবে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রণালিটি উন্মুক্ত করবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য একটি পথ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও পরিবাহিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি বিশাল অংশ এই জলসীমা দিয়েই বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। এই রুটটি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামরিক মহড়া, নিষেধাজ্ঞার বিস্তার এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে এই দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। তেহরান তাদের জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথকে ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল বজায় রেখেছে তারা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ কেবল আঞ্চলিক শান্তিই বিনষ্ট করবে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ চেইনে স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সংঘাত এড়াতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক মধ্যস্থতা ও আলোচনা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।