বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরকারিভাবে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের সপ্তম পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভায় এই আমন্ত্রণ জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলাকালে জাপানের জ্যেষ্ঠ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু জাপানি প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণ বার্তা পৌঁছে দেন। একই সঙ্গে তিনি ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকেও জাপান সফরের নিমন্ত্রণ জানান। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বৈঠকে ঢাকা ও টোকিওর মধ্যে বিভিন্ন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে, জাপানের ‘অফিশিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স’ (ওএসএ) কাঠামোর আওতায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি এই কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌকা সরবরাহ করেছে জাপান। বাংলাদেশের এই নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির অনুরোধে টোকিও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।
সভায় দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে জাপানের ধারাবাহিক অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে ঢাকা। এর মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রো রেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সবুজ জ্বালানি খাত এবং টেকসই উন্নয়নে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাপানি ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এর জবাবে জাপানি প্রতিনিধিদল জানিয়েছে যে ঋণের এই সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতিমালার আওতায় সব দেশের জন্যই সাধারণভাবে প্রযোজ্য।
পররাষ্ট্র সচিব স্তরের এই বৈঠকে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) সই করার প্রক্রিয়া, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, দুদেশের মধ্যে শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের অব্যাহত রাজনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা বজায় রাখার আহ্বান জানায় ঢাকা।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং জাপানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির জ্যেষ্ঠ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু। উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও সুসংহত ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করবে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহলের ধারণা।