বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকার পর উত্তরের জনপদ বগুড়াকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে বহুমুখী ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বর্তমান সরকার। সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, শিক্ষা, যোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই বগুড়াকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগুড়া কেবল একটি জেলা নয়, এটি সমগ্র উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। অথচ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কারণে এই জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। বর্তমান সরকার সেই ঐতিহাসিক ঘাটতি ও বৈষম্য পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সরকারের মূল লক্ষ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈষম্য দূর করে দেশের প্রতিটি জেলাকে সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া। বগুড়ার ক্ষেত্রে অতীতের অবহেলার মাত্রা বিবেচনায় রেখে কিছু অতিরিক্ত ও দ্রুতসম্ভাব্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন জাতীয় গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সরকারের উন্নয়ন দর্শনের আলোকে বগুড়ার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, নতুন শিল্প স্থাপন, পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি জনবান্ধব ও কার্যকর করা অন্যতম।
উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের কাজও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই রেলপথ চালু হলে উত্তরাঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজতর হবে, যার ফলে যাতায়াতের সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বগুড়ার অভ্যন্তরীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্টগুলোর বেহাল দশা দূর করতে পর্যায়ক্রমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চালানো হচ্ছে।
শিক্ষা খাতের প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন।
এছাড়া অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বিপ্লব ঘটাতে বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সুরক্ষায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হতে যাওয়া নতুন যুদ্ধবিমান এই ঘাঁটিতে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তুরস্কের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় এখানে একটি ড্রোন নির্মাণ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটবে এবং বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সরকার সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পুনঃখননকৃত খাল, নদী ও জলাশয়ের দুই তীরে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বড়াইল-বাকসন খালের দুই তীরে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাজেট বরাদ্দ সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, বগুড়াকে অতিরিক্ত বা মাত্রাতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। বিভিন্ন উন্নয়ন খাতের বরাদ্দের তালিকায় বগুড়া শীর্ষে অবস্থান করছে না, বরং দেশের অন্যান্য অনেক জেলা এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা উন্নয়ন ঘাটতি পূরণ করতেই এই প্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলতা এবং প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সম্ভাবনাময় জেলায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।