রাজধানী ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে তথ্যপ্রবাহ অবরুদ্ধ করার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের নির্দেশের একটি চাঞ্চল্যকর কল রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন পক্ষ। রবিবার (৯ আগস্ট) ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এই তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হয়। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনের বিভিন্ন কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের সহিংসতার তথ্য যেন দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য সুপরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত করার এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটির তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এই বিচারিক কার্যক্রমে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন ডিজিটাল ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তৎকালীন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন সে সময়ের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে। কল রেকর্ডে ওবায়দুল কাদেরকে তৎকালীন সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ মন্থর বা স্লো করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিতে শোনা যায়। ওই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন সাপেক্ষে প্রথমে ইন্টারনেট সেবা সীমিত করা হয় এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে আন্দোলনকারীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছিল। মাঠপর্যায়ের এই নৃশংসতা এবং বলপ্রয়োগের বাস্তব চিত্র গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করাকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের আড়ালে নির্বিচার দমনপীড়ন চালানো সহজতর হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করার পূর্বে এই অডিও কল রেকর্ডটির ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। একটি বিশেষায়িত ফরেনসিক ল্যাবে রেকর্ডটির সত্যতা, নির্ভুলতা এবং অডিওর উৎস নিশ্চিত হওয়ার পরই এটিকে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। আদালতের কার্যক্রমে আজ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কল রেকর্ড শোনানোর কথা রয়েছে, যা মামলার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এবং আসামিদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত রয়েছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যোগাযোগের মৌলিক অধিকার হরণের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর দিক একে একে উন্মোচিত হচ্ছে।