আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইকুয়েডরের প্রসিকিউটর কার্যালয় ২০২৩ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও দুর্নীতিবিরোধী আইনপ্রণেতা ফার্নান্দো ভিলাভিসেনসিও হত্যার ঘটনায় সাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছে। গত শনিবার প্রসিকিউটরদের পক্ষ থেকে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থেকে পরিকল্পনা, নির্দেশ প্রদান এবং অর্থায়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে গত ওই বছরের আগস্ট মাসে রাজধানী কুইটোতে নির্বাচনী প্রচারণাসভা শেষে বের হওয়ার সময় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ফার্নান্দো ভিলাভিসেনসিও। সে সময় তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও আইনপ্রণেতা হিসেবে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত ছিলেন এবং জনমত জরিপেও তার অবস্থান ছিল বেশ শক্তিশালী। নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল।
ইকুয়েডরের প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটনে জড়িত’ থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন দেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে সেরানো, সাবেক আইনপ্রণেতা রনি আলেগা, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ব্যবসায়ী জাভিয়ের জর্ডান এবং দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী অপরাধ চক্র ‘লস লোবোস’ গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত চার সদস্য। এর মধ্যে গ্যাংটির কথিত শীর্ষ নেতা উইলমের চাভারিয়া ওরফে ‘পিপো’-এর নামও রয়েছে, যিনি বর্তমানে স্পেন থেকে ইকুয়েডরে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি রয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যবসায়ী জাভিয়ের জর্ডান এই পুরো হত্যাকাণ্ডে আর্থিক জোগান ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়ার প্রশাসনের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে সেরানোর বিরুদ্ধে অপরাধী চক্র লস লোবোসের সদস্যদের কাছে ভিলাভিসেনসিওর চলাফেরা ও অবস্থানের গোপনীয় তথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সাবেক আইনপ্রণেতা রনি আলেগা হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে প্রসিকিউটর আনা হিদালগো উল্লেখ করেছেন। অপরাধ চক্রের নেতা চাভারিয়ার বিরুদ্ধে ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ছক কষার অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ভিলাভিসেনসিও বেঁচে থাকাকালীন সময়ে দেশটির বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং হত্যার পূর্বে একাধিকবার তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর ইকুয়েডরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনীতির অপরাধায়ন নিয়ে দেশটিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। এর আগে এই মামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার দায়ে অন্য পাঁচজনকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৪ বছরের কারাদণ্ডও রয়েছে, সাজা দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া হামলার দিন ঘটনাস্থলেই সন্দেহভাজন বন্দুকধারী নিহত হন এবং পরবর্তীতে কারাবন্দী অবস্থায় আরও বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন মারা যাওয়ার ঘটনা পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক এই অভিযোগ গঠন ইকুয়েডরের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, নেপথ্যের মূল কুশীলবদের সাজা নিশ্চিত করার বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।