খেলাধূলা ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকান ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশীয় ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)-সহ প্রধান প্রধান মহাদেশীয় গভর্নিং বডিগুলোর অভূতপূর্ব বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবনা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তবে প্রশাসনিক সংকট সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনের প্রভাব ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে বৈশ্বিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফিফার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি পৃথক বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফা আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক ও সম্প্রচার স্বত্বের ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করা। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক প্রজেক্ট থেকে সংগৃহীত বিপুল অর্থ ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের ফুটবল উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে বিতরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশের পরপরই ক্রীড়া অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উয়েফার অন্তর্ভুক্ত ৫৫টি সদস্য দেশ একযোগে ফিফার মূল প্রতিযোগিতা বর্জনের হুঁশিয়ারি দেয়। ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল গভর্নিং বডিগুলো অভিযোগ করে যে, ঐতিহ্যবাহী ফুটবল টুর্নামেন্টকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার এই সিদ্ধান্ত সংস্থার নীতি ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
পরিকল্পনাটি প্রত্যাহারের পর ফিফা সভাপতির প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। ইতিপূর্বে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো পুনর্নির্বাচিত হলেও সাম্প্রতিক এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তার ওপর থেকে আস্থা হারানোর কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে। বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন এবং ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। আগামী ফিফা নির্বাচনের পূর্বে এশিয়া ও আফ্রিকান অঞ্চলের জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনগুলোর ভোট নিজেদের পক্ষে রাখতে ইউরোপীয় জোট ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে।
এই সংকটের মধ্যেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের সাথে ইনফান্তিনোর সখ্যতার বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ যৌথভাবে সফল করার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের সাথে ফিফা প্রধানের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যদিও ফিফার গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বা নীতিনির্ধারণী ভোটাভুটিতে কোনো দেশের সরকারের সরাসরি কোনো ভোটাধিকার থাকে না, তবুও বৈশ্বিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ফিফার অন্তর্ভুক্ত অনেক ছোট ছোট জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রশাসনিক মহল থেকে ফিফার বাণিজ্যিক নীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপর বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও, ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের কূটনৈতিক সমর্থন আন্তর্জাতিক ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক অনন্য উপাদান হিসেবে কাজ করছে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে ইউরোপীয় একক আধিপত্য কমানো এবং বৈশ্বিক পরিসরে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে মার্কিন সম্পর্ক ইনফান্তিনোর জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাণিজ্যিক প্রজেক্ট বাতিল হলেও ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন চরম উত্তপ্ত। একদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার শক্তিশালী জোট ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য একত্রিত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ফিফা সভাপতি। সামনের দিনগুলোতে ফিফার সাধারণ পরিষদ ও প্রশাসনিক নির্বাচনে এই ক্ষমতার লড়াই বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যত গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।