বিশেষ প্রতিবেদক
জুলাই সনদকে ভিত্তি করে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি সমাজিক ও রাজনৈতিক সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে তাদের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এই প্রক্রিয়ায় জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, সাংবাদিক, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং সনদ প্রণয়নকারীদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী এসব তথ্যের জানান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় সংসদ গঠিত এই কমিটি কোনো আবেগভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে ভারতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মূল কাঠামো নীতিসহ আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক আইনশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতিসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটির সাংগঠনিক রূপরেখা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী জানান, শুরুতে ১৭ সদস্যের একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। যার রূপরেখা অনুযায়ী বিএনপির সাতজন সদস্য, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চারজন, একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ সংরক্ষিত রাখা হয়। তবে বিরোধী দল থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিনিধি দলের নাম জমা দেওয়া হয়নি। সংসদীয় প্রক্রিয়া সচল রাখতে বাকি সদস্যদের নিয়ে কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হলেও বিরোধী দলের যুক্ত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তারা নাম প্রস্তাব করা মাত্রই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হবে।
কমিটিতে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও প্রক্রিয়ার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, মূল জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৩টি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা সুপারিশগুলো সংশোধন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এছাড়াও যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনা, আইনি পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক পরামর্শের প্রতি কমিটি সর্বদা নমনীয় থাকবে।
জুলাই সনদের প্রয়োগগত দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, সনদে অন্তর্ভুক্ত ১ থেকে ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রস্তাবগুলো সাধারণ খসড়ার মতো নয়, বরং যথাযথ সাংবিধানিক ও আইনি পরিভাষায় রূপান্তর করে মূল সংবিধানে সংযোজন করা হবে। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন এবং বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টিও এই সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মতভিন্নতা রয়েছে এবং তা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সনদের নির্দেশনা অনুসরণ করে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।
একটি বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুরো সংবিধানটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে সংশোধিত ধারাগুলোর সাথে বিদ্যমান ধারাগুলোর আইনি সামঞ্জস্য বজায় থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন অত্যন্ত স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫০ সালের পর থেকে ভারতের সংবিধানে শতাধিকবার সংশোধনী আনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
কমিটির ভাষ্যমতে, এই রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম স্বল্পমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা ও প্রয়োজন বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে তাড়াহুড়ো না করে যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় সময় নিয়েই একটি টেকসই সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিভ রহমান, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল।