নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের তৎপরতা দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একটি ব্যাপক ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকা ও অপরাধপ্রবণ স্থানে পরিচালিত এই সাঁড়াশি অভিযানে মোট ৪৫৮ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উক্ত অভিযান চলাকালে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে বিভিন্ন আইনে মোট ৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে পুলিশি তল্লাশিতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য, মারাত্মক অস্ত্র, ২৮ লাখ টাকার সমমানের জালনোট এবং অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী এক বিশেষ বার্তায় গণমাধ্যমকে এই অভিযানের সার্বিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, রাজধানীজুড়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার অংশ হিসেবে ডিএমপির ৮টি অপরাধ বিভাগ এবং বিশেষায়িত দুটি ইউনিট একযোগে এই অভিযান সম্পন্ন করেছে। বিভাগওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযানকালে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মিরপুর বিভাগ এলাকা থেকে। অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের অংশ হিসেবে রাজধানীর মূল সড়ক, অলিগলি, বাস টার্মিনাল এবং সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে এই তল্লাশি চালানো হয়।
ডিএমপি থেকে সরবরাহ করা দাপ্তরিক তথ্যানুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার এই বিশেষ অভিযানে রাজধানীর রমনা বিভাগ থেকে ৩৪ জন, লালবাগ বিভাগ থেকে ৩৭ জন, ওয়ারী বিভাগ থেকে ৪৯ জন, মতিঝিল বিভাগ থেকে ৩৬ জন, তেজগাঁও বিভাগ থেকে ৫৭ জন, মিরপুর বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ১৩৫ জন, গুলশান বিভাগ থেকে ৩১ জন এবং উত্তরা বিভাগ থেকে ৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ৬ জন এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগ ২ জন সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
অভিযান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অপরাধীদের হেফাজত থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয়-বিদেশীয় আলামত জব্দ করে। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১১ কেজি ৯৮০ গ্রাম গাঁজা, ৬ হাজার ৩ ৩৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ৯০ বোতল নিষিদ্ধ ফেন্সিডিল। মাদকের পাশাপাশি একটি ওয়ান শাটারগান এবং একটি বড় সামুরাই জব্দ করা হয়, যা ছিনতাই ও ডাকাতির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিক ধারণায় জানা গেছে। এ ছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত ১৭টি মোবাইল ফোন, ৩০টি খালি চেক বইয়ের পাতা, নগদ ১ হাজার ৮০ টাকা এবং মোট ২৮ লাখ টাকার সমমানের জাল ব্যাংক নোট জব্দ করা হয়েছে।
ডিএমপির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চুরি, মাদকের বিস্তার এবং অর্থনৈতিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাচ্ছিল পুলিশ। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ পরবর্তী সময়ে বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে জাল টাকার চক্রের সক্রিয় হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২৮ লাখ টাকার জালনোট ও খালি চেক বই উদ্ধারকে এক বড় ধরনের সফলতা হিসেবে দেখছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এসব আলামত উদ্ধারের ফলে একটি বড় আর্থিক জালিয়াতি ও প্রতারক চক্রের মূল চেইন ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের সিংহভাগই চিহ্নিত অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী এবং জালিয়াতি চক্রের সক্রিয় সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা রজু করার পর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অনেককে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে তাদের অন্যান্য সহযোগীদের অবস্থান এবং উদ্ধারকৃত অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাকে অপরাধমুক্ত রাখতে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহতকারী যেকোনো অপরাধমূলক চক্রকে নির্মূল করতে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত ভিত্তিতে জোরদার করা হবে। মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টহল ও বিশেষ চেকপোস্ট বসানোর কার্যক্রমও চলমান থাকবে। অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ নাগরিকদের সচেতন হওয়ার এবং যেকোনো সন্দেহজনক বা বেআইনি কাজের তথ্য দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা ৯৯৯ নম্বরে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।