আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমান্তজুড়ে আকাশপথে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। সর্বসাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ২২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হামলায় নিহতদের মধ্যে ১৫ জন রাশিয়ার ভূখণ্ড ও অবরুদ্ধ ক্রিমিয়া উপদ্বীপের এবং বাকি ৭ জন ইউক্রেনের নাগরিক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় দেশের সীমান্ত এলাকায় বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার পর এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
রুশ প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ক্রাসনোদার, সীমান্তঘেঁষা বেলগোরোদ এবং মস্কোসংযুক্ত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। ক্রাসনোদার প্রদেশের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ জানান, কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় পর্যটন এলাকা গেলেন্দঝিকের আরখিপো-ওসিপোভকা পর্যটনপল্লীতে ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে ৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩ জন শিশু রয়েছে এবং এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৪০ জন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা।
একই দিনে কৃষ্ণসাগর উপদ্বীপ ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনীয় ড্রোনের পতিত ধ্বংসে ৪ জন নিহত ও ২ জন আহত হন। এ ছাড়া রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ প্রদেশে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একাধিক ড্রোন হামলায় ৪ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডেও হামলা জোরদার করেছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক প্রদেশের কৃভি রিহ জেলায় একটি পেট্রোল স্টেশনে বিস্ফোরকবাহী রুশ ড্রোন আঘাত হানলে এক জরুরি পরিষেবাকর্মী ও তার ৮ বছর বয়সী ছেলেসহ ৩ জন নিহত হন। দিনিপ্রোপেত্রোভস্কের গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা বার্তা সংস্থাগুলোকে জানান, ড্রোনটির আঘাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যার ফলে পেট্রোল স্টেশনটি এবং এর আশপাশের বেসামরিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রশাসনিক অঞ্চল জাপোরিজ্জিয়া প্রদেশে সোমবার রাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সমন্বিত হামলা চালায় রুশ সামরিক বাহিনী। সেখানে ২ জন শিশুসহ আরও ৪ জন নিহত হন এবং আশপাশের বেশ কিছু আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ খারকিভের সামরিক অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। ওই অঞ্চলের বিলিই কোলোদিয়াজ এবং উস্পেনিভকা নামক দুটি কৌশলগত বসতি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে রুশ পদাতিক বাহিনী।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার সময় বেসামরিক এলাকায় হামলা ও প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে গত কয়েক মাসে কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বেসামরিক মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। যদিও মস্কো ও কিয়েভ উভয় পক্ষই বারবার জোর দিয়ে দাবি করে আসছে যে তারা বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করে কোনো অভিযান পরিচালনা করছে না।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে কৌশলগত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের ভূখণ্ড হিসেবে যুক্ত করে রাশিয়া। পরবর্তীতে ইউক্রেনের মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগদানের প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সমঝোতা লঙ্ঘন ঘিরে উত্তেজনার জেরে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত পারের ড্রোন হামলার এই মাত্রা অঞ্চলে মানবিক সংকট ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিকে আরও জটিল করে তুলছে।