অর্থনীতি প্রতিবেদক
দেশের শিল্পখাতে নানা ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের সার্বিক চাহিদা কিছুটা হ্রাসের মধ্যেও এই অর্জন দেশের বাণিজ্যে নতুন স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পঞ্জিকা বর্ষে বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়েছে। বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে চীন। তালিকায় বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম, যাদের রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কম। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় চতুর্থ স্থানে ভারত এবং পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে তুরস্ক।
তবে বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে এই সূচকে টানা দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্যে দেখা যায়, বছর ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। বিপরীতে, তৃতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনাম একই সময়ে প্রায় ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনামের এই দ্রুত উত্থান এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থানকে ভবিষ্যতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান বর্তমানে খুব বেশি নয়। ভিয়েতনামের উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা (কম লিড টাইম) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের উচ্চ হার তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। একই সাথে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোও বিশ্ববাজারে নিজেদের বাজার অংশীদারিত্ব বাড়াতে কৌশলগত নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক মাহফুজ কবির এ প্রসঙ্গে জানান, ভিয়েতনাম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্ব পোশাক বাজারে তাদের অবস্থান শক্ত করছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশগুলোও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে দ্বিতীয় অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে অবিলম্বে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন বাড়াতে হবে। সেই সাথে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ মূলত ঐতিহ্যবাহী সুতি কাপড়ের (কটন-বেসড) তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজারে বর্তমানে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারের পোশাকের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও চীনের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এই ধরনের উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি দ্রুত পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন না ঘটায় এবং কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তবে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
এছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে আসন্ন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে উন্নত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হ্রাস পেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, সহজ শর্তে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।