আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ডামাডোল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৭ জুন স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে উভয় দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করলেও তা এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সমঝোতার শর্তগুলো মেনে না চলার বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল শনিবার টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে ইরানও পারস্য উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও স্থানীয় অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত করেছে।
গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেই আলোচনার পরপরই দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কেবল সামরিক স্থাপনা নয়, বরং বিমানবন্দর, সেতু, টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর গত ৬ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তাদের মতে, গত ১০ দিনে ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে মার্কিন হামলায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের অভিযানে ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার ও নৌবাহিনীর অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। হরমোজগান প্রদেশে সাম্প্রতিক হামলায় তিনজন নিহত এবং ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অপরদিকে, জর্ডানে ইরানের হামলায় গত শুক্রবার দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। এ নিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তত ১৬ জন মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। পাশাপাশি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক আগ্রাসন আগামী দু-তিন দিন অব্যাহত থাকলে ইরান ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করতে বাধ্য হবে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গত শুক্রবার কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সেখানকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা আংশিক ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাতেও ইরান হামলা চালানোর দাবি করেছে। একইসঙ্গে সৌদি আরবের রিয়াদের কাছে আল-খারজে অবস্থিত মার্কিন অবস্থান সম্বলিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সিরিয়াতেও যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এই সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর উদ্যোগের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চল এখন দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার মুখে পড়েছে।