আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহাম আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দলের বিশেষ সম্মেলনে তিনি দেশবাসীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষিতে নতুন কোনো জাতীয় নির্বাচন ছাড়াই বার্নহাম দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। আগামী সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করবেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক ও কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর বার্নহামের এ দায়িত্ব গ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত ১৮ জুন উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে ফেরার মাত্র চার সপ্তাহের মাথায় তিনি দলীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এলেন। লেবার পার্টির সংসদীয় দলের ব্যাপক সমর্থনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতা নির্বাচিত হন; দলের ৪০৩ জন এমপির মধ্যে ৩৭৯ জনই তার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
বার্নহামের রাজনৈতিক দর্শন মূলত রাষ্ট্রীয় সেবার পরিধি বাড়ানো এবং বিকেন্দ্রীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তিনবার দায়িত্ব পালন করা এই নেতা ‘কিং অব দ্য নর্থ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ‘নাম্বার ১০ নর্থ’ নামে একটি বিশেষ কার্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে অবহেলিত শিল্পাঞ্চল ও উপকূলীয় জনপদগুলোর উন্নয়নে তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গত ৪০ বছরের প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা হবে যা সব অঞ্চলের মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে।
তবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা বেশ দীর্ঘ। গত ১৪ বছর বিরোধী দলে থাকার পর ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলেও কিয়ার স্টারমারের শাসনামল নীতিগত বিচ্যুতি ও বিভিন্ন বিতর্কের মুখে পড়েছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের উচ্চ ঋণভার এবং অনিয়মিত অভিবাসন সমস্যা বার্নহামের প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সামাল দেওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাকে জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের অনিশ্চিত বৈদেশিক নীতি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, আগামী চার বছরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থঘাটতি পূরণ এবং সামাজিক কল্যাণ খাতের সংস্কার সাধন করা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে।
তবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের প্রধান করসমূহ বৃদ্ধি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। জনসেবা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং গৃহহীনতা মোকাবিলায় নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে তিনি স্টারমার সরকারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দোষারোপের রাজনীতির পরিবর্তে সমস্যা সমাধানের কার্যকর নীতি গ্রহণই হবে তার প্রশাসনের মূল লক্ষ্য বলে তিনি সম্মেলনে জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বার্নহামের নেতৃত্বের ওপর লেবার পার্টির সংসদ সদস্যদের বড় অংশের আস্থা রয়েছে, যারা মনে করেন স্টারমারের তুলনায় জনগণের সঙ্গে বার্নহামের যোগাযোগ স্থাপনের সক্ষমতা বেশি। সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের রাজনীতির নতুন এই অধ্যায়টি দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলানোর এক কঠিন সন্ধিক্ষণে শুরু হতে যাচ্ছে।