রাজনীতি ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে দেশের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদের যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন এবং ষড়যন্ত্র রুখতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় ও অটুট রাখা অপরিহার্য।
বুধবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতা অর্জন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন। ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি যেন আর কখনো দেশের গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার করা হচ্ছে। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে প্রণীত ৩১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনি ইশতেহার সাজানো হয়েছে। এছাড়া ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জাতীয় জুলাই সনদ’-এর আলোকে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বিগত সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার বিচারের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। এক্সট্রাডিশন বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়েছে। দেশে ফেরার পরপরই তাঁকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এছাড়া ইন্টারপোলের মাধ্যমে পলাতক ফ্যাসিবাদী সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, যার অংশ হিসেবে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রশাসনিক বা নির্বাহী আদেশে নয়, বরং আইনানুগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের দোসর এই সংগঠনের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অ্যাক্ট এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী অনুযায়ী ব্যক্তি শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে দল হিসেবেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। এছাড়া সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সংগঠন হিসেবেও বিচারের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদাহরণ টেনে বলেন, নাৎসি বাহিনী যেভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে পরিচালিত গণহত্যায় জড়িতদের দায় একইভাবে নির্ধারণ করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, এত বড় হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং তারা জুলাইয়ের বীরদের ‘জঙ্গিবাদী’ আখ্যা দিয়ে পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানেই একদলীয় শাসন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন এবং ছাত্র রাজনীতি কলঙ্কিত করার ইতিহাস।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ব্যবসায় ব্যবহার না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিপ্লবের কৃতিত্ব কেবল ছাত্র-জনতার, যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বুক পেতে লড়াই করেছে। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার জন্য গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির সঞ্চালনা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। সভার শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।