স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী চক্ষু স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনন্য এক নেতৃত্বের অবস্থানে উপনীত হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘গ্লোবাল সামিট অন আই হেলথ’-এর সহ-আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংস্কার ও সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হলো।
বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশে অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস কমাতে চক্ষু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ রোডম্যাপ’ শীর্ষক এক প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ ড. এম এ মুহিত এ কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের কাছে চক্ষু স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, প্রাইভেট সেক্টর ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে একটি ‘ন্যাশনাল আই কেয়ার প্ল্যান’ বা জাতীয় চক্ষু যত্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে একটি ‘ন্যাশনাল স্টেকহোল্ডার ওয়ার্কশপ’ অনুষ্ঠিত হবে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্পেক্স ২০৩০’ (SPECS 2030) ইনিশিয়েটিভ যাত্রা শুরু করবে।
চক্ষু সেবার বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ড. মুহিত বলেন, দেশে বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক মানুষ ছানিজনিত সমস্যার কারণে অন্ধত্বের শিকার। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত অস্ত্রোপচার সেবা পৌঁছে দেওয়া সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
দ্বিতীয়ত, চশমার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চশমার অভাবে গ্রামীণ পর্যায়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে এবং মধ্যবয়সী কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে। সব বয়সী মানুষের জন্য মানসম্মত চশমা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় উৎপাদনশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, অসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ায় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা ডায়াবেটিসজনিত অন্ধত্বের ঝুঁকি বেড়েছে। এটি প্রতিরোধে দেশের জেলা পর্যায় পর্যন্ত ‘ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি স্ক্রিনিং’ সেবা দ্রুত চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীদের দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন, হেলথ ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই সমন্বিত উদ্যোগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি মাইলফলক হতে পারে। এটি কেবল রোগীদের সেবাপ্রাপ্তিই নিশ্চিত করবে না, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
প্রস্তুতিমূলক এই সভায় স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এস এম ক্বাদির এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি দলের সদস্য ড. ওয়াতিন আলম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বেসরকারি গবেষণা সংস্থা আর্ক ফাউন্ডেশনের পরিচালক রোমানা হক ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট বদরুদ্দীন সাইফিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অসরকারি সংস্থার (আইএনজিও) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সুপরিকল্পিত এই রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের চক্ষু স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আসবে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।