অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের শিক্ষিত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে নয় লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্মসংস্থান ব্যাংক। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও বেগবান করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যেই এই বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই প্রায় সোয়া লাখ থেকে দেড় লাখ বেকার যুবককে কর্মসংস্থানের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এক হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত এই তহবিলের মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে ৫০ হাজার নতুন বেকারকে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসারে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এই ঋণ বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ বেকার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ৪ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা দিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় অতিদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেশের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পটি মাঠপর্যায়ে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে কর্মসংস্থান ব্যাংক।
এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ডাব ও ফল বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, চা-পানের দোকানি, সেলাই ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত পুঁজিহীন দরিদ্র ব্যক্তি এবং কর্মহীন স্বল্পপুঁজির ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত এই ঋণ সুবিধা পাবেন উপকারভোগীরা। শুধুমাত্র ঋণ বিতরণের মধ্যেই এই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ঋণের অর্থ সঠিক খাতে বিনিয়োগ, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পণ্যের বিপণন, কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সার্বিক সহায়তা দেওয়া হবে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা অর্জন এবং স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রাথমিকভাবে দেশের শেরপুর, বরগুনা ও কুড়িগ্রাম জেলার ২০টি উপজেলাকে এই পাইলট প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। কর্মসংস্থান ব্যাংকের নির্ধারিত ৮টি শাখার মাধ্যমে এসব এলাকার প্রায় ৮ হাজার মানুষকে মোট ৫০ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ, যার মধ্যে ৩ শতাংশ যাবে সিড ফান্ডে এবং বাকি ৩ শতাংশ ব্যাংকের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে এর পরিধি আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসংস্থান ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পগুলো সফল হলে দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মূলত পর্যাপ্ত পুজির অভাবে উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত হতে পারে না, যার ফলে অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাদের এই নিবিড় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে। ইতোমধ্যে প্রশিক্ষিত বেকারমুক্ত উপজেলা গঠনের অংশ হিসেবে রংপুরের বদরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে পরিকল্পিত কর্মসংস্থান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই দুই উপজেলাকে পুরোপুরি প্রশিক্ষিত বেকারমুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকটি বেকার যুবকদের পণ্য উৎপাদন, আধুনিক নকশা উন্নয়ন, বিপণন এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে সময়োপযোগী পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফাইন্যান্সিং’ ও শরিয়াহভিত্তিক ঋণ কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এই সার্বিক উদ্যোগকে বেগবান করতে চলতি বছরকে ‘স্বচ্ছ ব্যাংকিং ও টেকসই কর্মসংস্থানের বছর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ঋণগ্রহীতারা যাতে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারেন, সেজন্য নিবিড় মেন্টরিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা ঋণ আদায়ের হার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে।
তবে এই বৃহৎ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে তীব্র জনবল সংকট। ব্যাংকের অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৩ হাজার ২০০ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৮০০ জন। দেশের প্রতিটি শাখায় গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে মাঠপর্যায়ে নতুন ঋণগ্রহীতা অন্বেষণ, ঋণ বিতরণ, ঋণ-পরবর্তী তদারকি এবং সঠিক সময়ে ঋণ আদায়ের কাজ একসঙ্গে সুচারুভাবে সম্পন্ন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে জনবল কাঠামো শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই উৎপাদনমুখী ঋণ কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।