শীর্ষ সংবাদ ডেস্ক
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পর্যালোচনার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল হয়েছে। আপিল বিভাগের এই আদেশের পর সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, দেশের আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে উল্লেখ করেন, এই রায় কেবল আইনি বিজয়ই নয়, এটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মূলত বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল। সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম হলো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের কাছে এর আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি জানান, পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট আপিলগুলো খারিজ করে দেওয়ায় সেই রায়টি চূড়ান্তভাবে বহাল থাকল। হাইকোর্টের রায়ের মূল ভিত্তিই ছিল সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা, গণভোটের বিধান পুনরুজ্জীবিত করা এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল রোধের নামে যুক্ত করা সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল করা। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের ফলে হাইকোর্টের পূর্বতন রায়টিই চূড়ান্ত আইনি বৈধতা পেল।
আইনি প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস করা হয়েছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয় এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বিলুপ্ত করা হয়। এই বিলুপ্তির পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বীকৃতি ও জাতীয় চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে, বিগত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ওই বছরই পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ আইন এবং এর কিছু সুনির্দিষ্ট ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। দীর্ঘ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট বাতিলের জন্য দায়ী তৎকালীন আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারা সম্পূর্ণ অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদকে সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে তা বাতিল করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে, ২০২৫ সালের ৮ জুলাই হাইকোর্টের এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হওয়ার পর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যান্য পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল আবেদন জানান। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর সেই আবেদন মঞ্জুর করলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক আপিল দায়ের করা হয়। সেই আপিলগুলোই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত শুনানির পর খারিজ হয়ে গেল। এই আদেশের ফলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।