আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত চারটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে হামলা চালিয়েছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সামরিক ঘাঁটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আইআরজিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের ‘আরিফজান’ ও ‘আলি আল সালেম’ এবং বাহরাইনের ‘জুফাইর’ ও ‘শেখ ইসা’ নামের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে এই প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এ ছাড়া উত্তর গোলস্তান প্রদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও মার্কিন বাহিনী বোমাবর্ষণ করে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত ওই মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও জবাব হিসেবেই এই ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে আরও কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি অঞ্চলে আবারও এই ধরনের কোনো আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি করে, তবে ইরান এর চেয়েও ভয়াবহ ও বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া জানাবে। সে ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকেও ইরানের পাল্টা আঘাতের আওতায় আনা হবে বলে বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে।
বিবৃতিতে উদ্ভূত পরিস্থিতির রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়, ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় প্রতিবেশী ইরাকে যে নজিরবিহীন গণজমায়েত ও মানুষের ঢল নেমেছিল, তাতে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা কৌশলগতভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ভিন্ন খাতে সরিয়ে নিতে এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ভীতি আড়াল করতেই মার্কিন প্রশাসন তড়িঘড়ি করে ইরানের ওপর ওই বিমান হামলা চালিয়েছিল।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী দেশ কুয়েত ও বাহরাইনের অভ্যন্তরে অবস্থিত ঘাঁটিতে ইরানের এই সরাসরি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনাকে এক নতুন ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় নিয়ে গেছে। কুয়েত ও বাহরাইন—উভয় দেশই দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও নৌঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (ফিপথ ফ্লিট) এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রধান কেন্দ্র। ফলে এই ঘাঁটিগুলোতে হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও তাদের কৌশলগত অংশীদারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
এই হামলার পর পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন করে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল আশঙ্কা করছে, উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে এখন পর্যন্ত মার্কিন পেন্টাগন বা কুয়েত ও বাহরাইন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে এই অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত থমথমে এবং অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।