সারাদেশ ডেস্ক
বান্দরবানের লামা উপজেলায় টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় শিশুসহ একই পরিবারের তিনজন এবং এক দম্পতিসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোররাতে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় এই পৃথক দুর্ঘটনা দুটি ঘটে। নিহতরা সবাই বসতঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার ভোর রাত আনুমানিক ৪টার দিকে। প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল ও অতিবৃষ্টিতে ধসে পড়া পাহাড়ের বিশাল মাটির স্তূপ একটি বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা একই পরিবারের মো. ইউনুস (৪০), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাঁদের ৫ বছর বয়সী সন্তান মো. সোলেমান তাৎক্ষণিকভাবে মাটিচাপা পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে একই এলাকায় দ্বিতীয় পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে। পাহাড়ের ভারী মাটির ধাক্কায় একটি একতলা পাকা ঘরের দেয়াল ধসে পড়ে। ঘরের ভেতরে থাকা স্বামী মো. জুয়েল (৩৪) ও স্ত্রী কুলছুমা আক্তার (২৫) দেয়াল ও মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান।
দুর্ঘটনার পর পরই স্থানীয় বাসিন্দাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন উদ্ধার কাজে এগিয়ে আসেন। পরবর্তীতে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় পুলিশের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাটি ও ধ্বংস্তূপের নিচ থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জেলার পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান, আজিজনগর এলাকায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া ও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে অবিরাম ও অত্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ের মাটির ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়ে এই ধসের সৃষ্টি হয়েছে। লামাসহ বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে পাহাড়ধসের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। একই সাথে নতুন নতুন নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় স্থানীয় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে অনতিবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং ও সচেতনতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিজস্ব সম্পদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়িতে অবস্থান করছেন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা আংশিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে উপদ্রুত এলাকাগুলোর সাথে জেলা সদরের তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনায় বেগ পেতে হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।