শীর্ষ সংবাদ ডেস্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক রবিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি দেশের অসংখ্য গুণগ্রাহী ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরসূরি রেখে গেছেন। প্রখ্যাত এই চিন্তাবিদের আকস্মিক মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। তিনি জানান, দুপুরে মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মিরপুরের একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। কর্মজীবনে তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, বরং স্বাধীনচেতা, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তক ও প্রগতিশীল তত্ত্বের প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে অনন্য স্থান করে নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনে তিনি আজীবন সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা এবং এর প্রায়োগিক উৎকর্ষ সাধনে তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ও লেখালেখি জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণে বিভিন্ন সময় প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের মননশীল প্রবন্ধ সাহিত্য ও গবেষণায় আবুল কাসেম ফজলুল হকের অবদান অপরিসীম। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী দুটি চিন্তাশীল সাময়িকপত্র ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ সম্পাদনা করতেন, যা দেশের প্রগতিশীল তরুণ সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা গঠনে দীর্ঘ সময় ধরে খোরাক জুগিয়েছে। সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে তার রচিত দুই ডজনেরও বেশি গ্রন্থে। তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’, ‘রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি’ এবং ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’।
তত্ত্ব ও দর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস নিয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনা রয়েছে। তার নিখুঁত সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ‘স্বদেশচিন্তা’ গ্রন্থ দুটি দেশের সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মননশীল গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তাকে দেশের অন্যতম শীর্ষ সারস্বত সম্মাননা ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতির পদে আসীন করে, যে পদে তিনি আমৃত্যু নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতাল থেকে মরহুমের মরদেহ প্রথমে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তার দাফনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেশের বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদের প্রয়াণকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও গবেষকরা। তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।