নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে চক মোগলটুলী এলাকার হাজী আবুল বাশার সুপার মার্কেটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিটের প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টার যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ততক্ষণে ভবনের তৃতীয় তলার চারটি দোকান ও বিপুল পরিমাণ মালামালসহ বেশ কয়েকটি গোডাউন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। তবে সময়মতো ভবন খালি করে ফেলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক অঞ্চলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ঘাটতি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়টি এই ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় সামনে এসেছে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের পরিদর্শক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গতকাল বেলা ১টা ৩৪ মিনিটে চক মোগলটুলীর ১১৭/৮৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত আট তলা বিশিষ্ট হাজী আবুল বাশার সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। সংবাদ পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের লালবাগ স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সদর দপ্তর থেকে আরও চারটি ইউনিট উদ্ধার ও অগ্নি নির্বাপণ কাজে যোগ দেয়। ফায়ার সার্ভিসের মোট ছয়টি ইউনিটের সম্মিলিত চেষ্টায় বেলা ৩টা ১৪ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গতকাল দুপুরে ভবনের তৃতীয় তলার একটি ছাতার দোকান থেকে প্রথম ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পাশ্ববর্তী দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে পুরো ফ্লোরে আতঙ্ক তৈরি হয়। ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতারা দ্রুত চিৎকার করে ভবন থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। ধোঁয়ার কালো কুণ্ডলী ভবনের ওপর দিয়ে বের হতে থাকায় তা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। প্রাথমিক অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজস্ব উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও সংকীর্ণ পরিবেশের কারণে ব্যর্থ হন।
লালবাগ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আগুনে ভবনের তৃতীয় তলার চারটি বড় দোকান এবং সেগুলোর সাথে সংযুক্ত পাইকারি গোডাউনগুলো পুড়ে গেছে। ওই ফ্লোরে মূলত সিটি গোল্ডের গহনা, ইলেকট্রিক বাল্ব, ছাতা এবং বিভিন্ন ধরনের তৈরি ব্যাগের পাইকারি দোকান ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ছাতার দোকানের মালিক মোহাম্মদ আলী দাবি করেছেন, অগ্নিকাণ্ডের ফলে তাদের কয়েক কোটি টাকার ব্যবসায়িক পুঁজি ও মালামাল ছাই হয়ে গেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোনের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি ও ঘনবসতিপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এবং কাজ শুরু করতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের চরম বেগ পেতে হয়েছে। আট তলা বিশিষ্ট ওই বাণিজ্যিক ভবনটিতে জরুরি নির্গমন পথ তো দূরের কথা, সাধারণ চলাচলের জন্য মাত্র দুই ফুট চওড়া একটি সিঁড়ি রয়েছে। সংকীর্ণ এই সিঁড়ি দিয়ে একই সাথে দুজনের যাতায়াত করাও অসম্ভব। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের সময় ভেতরের অধিকাংশ দোকান ও গোডাউনের শাটারে তালাবদ্ধ থাকায় সেগুলো ভাঙতে ফায়ার সার্ভিসের বেশ সময় অপচয় হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গুদামগুলোতে প্লাস্টিক, ছাতা, ব্যাগ ও ইলেকট্রনিক্স মালামালের মতো দাহ্য পদার্থের মজুত থাকায় আগুন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটিতে কোনো ধরনের প্রাথমিক অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল না বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও ফায়ার সার্ভিসের তদন্তকারী দল নিশ্চিত করেছে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, ভবনের জরাজীর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন থেকে সৃষ্ট শর্টসার্কিটই এই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এবং আগুনের প্রকৃত উৎস নিশ্চিত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এই ঘটনা পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক অগ্নি নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের তাগিদকে আবারও জোরালো করে তুলেছে।