খেলাধূলা ডেস্ক
চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে একের পর এক বৈচিত্র্যময় পরিসংখ্যান ও অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের সৃষ্টি হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। চলমান এই বিশ্ব আসরে এমনই এক নতুন ও ব্যতিক্রমী পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, যেখানে ড্রিবলিং বা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দক্ষতায় পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ও অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ছাড়িয়ে গেছেন আফ্রিকান দেশ কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বের ম্যাচ শেষে সংগৃহীত তথ্য ও ম্যাচ বিশ্লেষণ থেকে এই কৌতূহলোদ্দীপক পরিসংখ্যানটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় একজন গোলরক্ষকের সফল ড্রিবলিংয়ের সংখ্যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডকে পেছনে ফেলে দেওয়ার এই ঘটনাটি ফুটবল বিশ্লেষকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রাউন্ড অব থার্টি-টু বা শেষ বত্রিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে এই বিরল কীর্তিটি স্থাপন করেন। ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার শক্তিশালী ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেসের তীব্র ও হাই-প্রেসিং আক্রমণের মুখে নিজের ডি-বক্সের ভেতর বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন ভোজিনহা। চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তিনি মাথা ঠান্ডা রেখে শরীরী ভাষা ও গতির পরিবর্তন ঘটিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মার্তিনেসকে কাটিয়ে বল সতীর্থের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের দেশের হয়ে খেলা চার ম্যাচে এটিই ছিল কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষকের একমাত্র সফল ড্রিবলিং।
ফুটবলের আধুনিক নিয়মানুযায়ী বিল্ড-আপ প্লে বা নিচ থেকে আক্রমণ রচনার ক্ষেত্রে গোলরক্ষকদের পাসিং ও ড্রিবলিংয়ের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলেন ভোজিনহা। অন্যদিকে, এই একটিমাত্র সফল ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমেই তিনি পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে এই বিশেষ পরিসংখ্যানে পেছনে ফেলে দেন। কারণ, চলতি বিশ্বকাপে চার ম্যাচ খেলে মাঠের একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করলেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখনো পর্যন্ত একটিও সফল ড্রিবলিং করতে সক্ষম হননি।
পর্তুগালের অধিনায়ক ও পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী রোনালদো টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে দলের পক্ষে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে নিজের স্কোরিং দক্ষতার প্রমাণ দিলেও ব্যক্তিগত ড্রিবলিংয়ের নৈপুণ্যে বেশ পিছিয়ে রয়েছেন। গ্রুপ পর্বের তিনটি পূর্ণ ম্যাচ এবং পরবর্তী সময়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ নকআউট পর্বের ম্যাচে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার পরেও প্রতিপক্ষের কোনো ডিফেন্ডার বা মিডফিল্ডারকে ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে কাটিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সফল হতে পারেননি। পর্তুগালের আক্রমণভাগে রোনালদোর মূল ভূমিকা এখন মূলত গোল করা এবং ডি-বক্সের ভেতরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় মাঠের মাঝভাগে কিংবা উইংয়ে তার ড্রিবলিংয়ের প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বয়স এবং খেলার পজিশনে পরিবর্তনের কারণে আধুনিক ফুটবলে রোনালদোর খেলার ধরনে বড় ধরনের রূপান্তর এসেছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে উইঙ্গার হিসেবে গতি ও ড্রিবলিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও বর্তমানে ৩ নম্বর স্ট্রাইকার বা প্রথাগত নাম্বার নাইন হিসেবে তিনি বক্সে বেশি অবস্থান করছেন। এর বিপরীতে, আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকদের পাসিং ও বল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির কারণে ভোজিনহার মতো গোলরক্ষকরাও আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মতো ড্রিবলিং করতে দ্বিধাবোধ করছেন না। পর্তুগালের হয়ে রোনালদো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক গোল পেলেও এই বিশেষ পরিসংখ্যানে একজন আফ্রিকান গোলরক্ষকের কাছে পিছিয়ে পড়ার ঘটনাটি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম এক স্মরণীয় এবং বৈচিত্র্যময় অধ্যায় হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।