কৃষি প্রতিবেদক
কৃষি কার্ড চালুর মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের অনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। তিনি জানিয়েছেন, এই কার্ডের মাধ্যমে দেশব্যাপী কৃষকদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হচ্ছে, যা ফসলের উৎপাদন, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে অনেক সময় কৃষকেরা চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করেন, যার সুফল লুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং কোন ফসলের বাজার চাহিদা কেমন, তা সরকার নিখুঁতভাবে তদারকি করতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় আলু বা অন্য কোনো ফসলের উৎপাদন বেশি হলে, সেখানকার কৃষকদের আগাম চাহিদা জানিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে বাজারে জোগান ও চাহিদার সঠিক সামঞ্জস্য থাকবে এবং ফরিয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের ঠকানোর সুযোগ পাবে না।
কৃষি খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা—মৌসুমী ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং সংরক্ষণাগারের অভাবের বিষয়টিও মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একেক মৌসুমে নির্দিষ্ট কিছু সবজি বা ফসলের বাম্পার ফলন হয়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। অনেক সময় টমেটো বা অন্যান্য পচনশীল সবজি ক্ষেত থেকে তুলে বাজারে আনার পরিবহন খরচও কৃষকেরা তুলতে পারেন না। ফলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত ফসল মাঠেই নষ্ট হয়, যা প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ফসলের অপচয় রোধ ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘মিনি কোল্ডস্টোরেজ’ বা ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। হিমাগারগুলো যেন নির্বিঘ্নে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচালিত হতে পারে, সেজন্য এগুলোকে সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি থাকবে না এবং কৃষকেরা দীর্ঘ সময় তাদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করতে পারবেন।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে টেকসই ও বেগবান করতে কৃষির সঙ্গে সরাসরি জড়িত জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের সুরক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি ও নানা সংকটে যেসব হতদরিদ্র কৃষক বিপুল পরিমাণ কৃষি ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য একটি বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব তালিকাভুক্ত হতদরিদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং কৃষকেরা নতুন উদ্যমে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।