বিশেষ প্রতিবেদক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে নিহত ইমন হোসেন আকাশ হত্যা মামলার তদন্তে নেমে এক নজিরবিহীন গোলকধাঁধায় পড়েছে পুলিশ। প্রায় দুই বছর ধরে তদন্ত চালিয়ে ৬৫০ জন আসামির মধ্যে ৫৪৯ জনেরই কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি তদন্তকারী সংস্থা। এজাহারে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে তিন জেলার ওয়ার্ড পর্যায়ের সাধারণ নেতা-কর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এই একটি মাত্র মামলাই নয়, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর সারা দেশে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার প্রায় প্রতিটির ক্ষেত্রেই একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় পার হলেও সিংহভাগ মামলারই চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন ভোকেশনাল শিক্ষার্থী ইমন হোসেন আকাশ। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় ৬৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তভার পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মকর্তার হাত ঘুরে সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনের ওপর ন্যস্ত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি বহু সাধারণ মানুষের নাম এজাহারে থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), ভিডিও ফুটেজ এবং ছবি বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে দেখা গেছে, আসামিদের একটি বড় অংশই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না, এমনকি তাদের মধ্যে কয়েকজন বৃদ্ধ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীও রয়েছেন। ফলে তদন্তের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয়েছে নির্দোষ ব্যক্তিদের বাছাই করে বাদ দেওয়ার কাজে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে দায়ের হওয়া মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৯৯টিই হত্যা মামলা। বিপুলসংখ্যক এই মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০৬টি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে মাত্র ৩১টি। বাকি ১ হাজার ৭৪৯টি মামলাই বর্তমানে তদন্তাধীন অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার পরপরই কোনো ধরনের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ছাড়া ঢালাওভাবে শত শত মানুষকে আসামি করে মামলা করার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনার বিপরীতে একাধিক মামলা হওয়া, ঘটনাস্থলের বাস্তব বিবরণের সাথে এজাহারের অমিল থাকা, এমনকি বাদীর পক্ষ থেকে আসামিদের চিনতে না পারার মতো ঘটনা তদন্ত প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
এদিকে পিবিআইয়ের অধীনে তদন্তাধীন ২৭২টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আদালতে সরাসরি দায়ের হওয়া (সিআর) মামলাগুলোর মধ্যে ব্যর্থতার বা অপ্রমাণিত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৬৪ শতাংশ। ১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে ১৪২টি নিষ্পত্তি হলেও তার মধ্যে মাত্র ৯০টি মামলা প্রমাণিত হয়েছে। অবশিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে ভিকটিম বা ভুক্তভোগীর সন্ধান মেলেনি, কিছু মামলা প্রমাণিত হয়েছে সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে এবং বাকিগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব ও বাদীর অসহযোগিতার কারণে আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, থানায় দায়ের হওয়া ৭৭টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৭টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে, এবং বাকি ৪০টি মামলার তদন্ত এখনো চলমান।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অতি-উৎসাহী হয়ে বা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ঢালাও মামলার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত দিতে হচ্ছে বিচারব্যবস্থাকে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই বিশাল আসামির তালিকা ও অসংগতিপূর্ণ এজাহারগুলো বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, মামলার সংখ্যা ও আসামির তালিকা দীর্ঘ হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি মামলাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই তদন্ত সম্পন্ন করা হচ্ছে।