নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ও জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে কোনো একক আদর্শ, দর্শন বা চিন্তার আধিপত্য মানব সভ্যতার জন্য স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, জগতের সব ধরনের বৈচিত্র্য, ভিন্নমত ও আদর্শের অবাধ আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। আর এর জন্য মুক্ত ও দায়িত্বশীল বুদ্ধিচর্চার কোনো বিকল্প নেই।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি অভিজাত হোটেলে বৈশ্বিক গবেষণা, সংলাপ ও জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও গবেষণামূলক অবদানের ক্ষেত্রে এই প্ল্যাটফর্মটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠবে বলে নীতিনির্ধারকেরা আশা প্রকাশ করছেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক দিকের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন বিভ্রান্তি, বিভাজন ও ভাসাভাসা আলোচনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। ভাষা, জাতিসত্তা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠী এককভাবে বিশ্বকে শাসন বা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। অতীতের কোনো একক বীর কিংবা সমাজ একা বিশ্ব সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। তাই সব মতাদর্শের স্কলার ও গবেষকদের এমন এক সাধারণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা মানব সভ্যতার কল্যাণ বয়ে আনবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রীয় নীতির ওপর আলোকপাত করে মন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার সব ধরনের বৈচিত্র্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে নিজের কথা বলবেন এবং সুস্থভাবে সেই মতাদর্শের আদান-প্রদান হবে—এটিই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আল-উম্মাহ জার্নালের ঘোষিত উদ্দেশ্য বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও তুর্কি—এই চারটি ভাষায় জার্নালটি প্রকাশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সংস্কৃতির গভীর বোঝাপড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ের সকল ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জার্নালের সম্পাদক ইন চিফ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত তুর্কি লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই।
অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই তাঁর বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সেই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানচর্চার সংযোগ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। আল-উম্মাহ বিশ্বজুড়ে চিন্তাবিদ ও গবেষকদের সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই প্যানেল আলোচনায় সমকালীন মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যমের ভূমিকা, শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা করা হয়। বক্তারা বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতা ও সংকট নিরসনে এ ধরনের বৈশ্বিক গবেষণা ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।