বিশেষ প্রতিবেদক
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বহুল বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি বিলোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন। বিভিন্ন অংশীজন ও খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই ধারাটি বাতিলের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী এবং জনগণের সম্পদ আত্মসাৎকারীদের কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার কঠোর বার্তা দিল প্রশাসন।
সংসদ সূত্রে জানা গেছে, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করার সময় সংসদে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, যা ১৮(ক) ধারা নামে পরিচিত। এই ধারার বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ে রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা ওই ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার বা মালিকানায় ছিলেন, তারা পরবর্তী সময়ে পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায়-দেনা ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করার সুযোগ পেতেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকেও এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার এখতিয়ার লাভ করেছিল।
আইনে এই ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সংসদের বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, বিগত সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ দখলকারী এস আলম গ্রুপসহ অন্যান্য বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও গোষ্ঠীর হাতে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিতর্কিত ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এই ধারার কারণে আমানতকারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এই পটভূমিতে ধারাটি সম্পূর্ণ বিলোপের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, ব্যাংক খাতের লুটপাটকারীদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ রাখা হবে না।
পাশাপাশি, একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর গ্রাহকদের আমানত ফেরতের বিষয়েও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। গ্রাহকদের আমানতের অবশিষ্ট অর্থ পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে ও ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করে ক্যানসার আক্রান্ত ও কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নের সার্বিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য কেবল তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা নির্ভর করে সঠিক ও সুষম বাস্তবায়নের ওপর। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক খাতের জবাবদিহি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর সরকার এখন থেকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবে। ব্যাংক খাতের আইনি সংস্কারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।