অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম প্রধান শেয়ার বাজার সূচক ‘ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ইনকরপোরেশন। গত সোমবার (২৯ জুন) বাজার খোলার পর থেকে সূচকে অ্যালফাবেটের এই অন্তর্ভুক্তি কার্যকর হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভেরিজন কমিউনিকেশনসকে প্রতিস্থাপন করে এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তি খাতের বৈশ্বিক এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটি। এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও গুরুত্ব আরও জোরালো হলো বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
পুঁজিবাজারের তথ্যানুযায়ী, ডাও জোন্স সূচকে অন্তর্ভুক্তির প্রথম দিনেই সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অ্যালফাবেটের ‘ক্লাস এ’ শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। লেনদেন চলাকালীন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৪৯ দশমিক ৯৭ ডলারে পৌঁছায়। এই পরিবর্তনের ফলে ১৩০ বছরের পুরোনো এবং ৩০টি বৃহৎ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত ডাও জোন্স সূচকে আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের মতো দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্রগুলোর অবস্থান এই সূচকে আরও জোরালো হবে।
বাজার সূচক পরিচালনাকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি ডাও জোন্স ইনডাইসেস জানিয়েছে, আধুনিক যোগাযোগ সেবা খাত এখন আর কেবল প্রথাগত টেলিকম সেবা কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারই এখন এই খাতের মূল চালিকাশক্তি। অ্যালফাবেটের অন্তর্ভুক্তির ফলে ডাও জোন্স সূচকটি মার্কিন অর্থনীতির সমসাময়িক রূপান্তরকে আরও সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হবে। ডাও জোন্স একটি ‘প্রাইস-ওয়েটেড’ সূচক হওয়ায়, যে কোম্পানির একক শেয়ারের দাম যত বেশি, সূচকে তার প্রভাব বা ভর তত বেশি থাকে। ভেরিজন কমিউনিকেশনসের শেয়ারের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সূচকে তার প্রভাব ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে অ্যালফাবেটের উচ্চ শেয়ার মূল্যের কারণে সূচকে এর অংশীদারিত্ব প্রায় ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা এটিকে সূচকের অন্যতম প্রভাবশালী উপাদানে পরিণত করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ সাতটি প্রযুক্তি কোম্পানি—যাদের একত্রে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ বলা হয়, তার মধ্যে এখন পাঁচটি কোম্পানিই এই সূচকে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করল। অ্যালফাবেটের আগে থেকেই ডাও জোন্সে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যামাজন ও এনভিডিয়ার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এই অন্তর্ভুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তি খাতের নেতৃত্বকে নতুনভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ডাও জোন্স সূচক থেকে বাদ পড়ার পর টেলিযোগাযোগ জায়ান্ট ভেরিজন কমিউনিকেশনসের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। সোমবার লেনদেনের একপর্যায়ে ভেরিজনের শেয়ারের দাম প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪২ দশমিক ০৩ ডলারে নেমে আসে। ১৯৮৪ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে ডাও জোন্সের অংশ থাকা এই টেলিকম প্রতিষ্ঠানের বিদায়কে বাজার সংশ্লিষ্টরা একটি যুগের অবসান এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির উত্থান হিসেবে দেখছেন। যদিও বিশ্বজুড়ে অনেক বিনিয়োগকারী সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বা নাসডাক সূচকের ওপর বেশি নির্ভর করেন, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবণতা এবং ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর গতিপ্রকৃতি বুঝতে ডাও জোন্সের গুরুত্ব অপরিসীম। ডাও জোন্সে অ্যালফাবেটের এই অন্তর্ভুক্তি আগামী দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।