আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা ও কড়া জবাব দিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি আমেরিকা-বিরোধী নন, তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কারও কাছে মাথানত করতে রাজি নন। ট্রাম্পের মন্তব্যের জের ধরে ওয়াশিংটন ও রোমের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জর্জিয়া মেলোনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “আমি আমেরিকা-বিরোধী নই এবং একই সঙ্গে আমি কারও কাছে হাঁটু গেড়েও বসে নেই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, পশ্চিমা দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে সামগ্রিকভাবে বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।” মেলোনি আরও উল্লেখ করেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব ও মজবুত ভিত্তির জন্য স্পষ্টবাদিতা অত্যন্ত জরুরি এবং তিনি সবসময় নীতিগত বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলতেই পছন্দ করেন।
এই কূটনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয় কয়েকদিন আগে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। উক্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি তার সঙ্গে আলোকচিত্র তোলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “তিনি আমার সাথে ছবি তোলার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলেন। সাধারণ পরিস্থিতিতে আমি হয়তো ছবি তুলতাম না, কিন্তু তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েই আমি সম্মত হয়েছিলাম।” ট্রাম্প আরও দাবি করেন, মেলোনির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করার কোনো বাধ্যবাধকতা তার ছিল না, তবে তিনি সৌজন্যতাবশত কথা বলায় ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য ইতালি সরকারের শীর্ষ মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যকে কেবল মেলোনির ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে, একে সমগ্র ইতালির রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করছে রোম। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে পুরো ইতালির জন্য ‘অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আচরণের প্রতিবাদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাজানি আগামী ২১ ও ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে তার নির্ধারিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর বাতিল করার ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত দুই ন্যাটোভুক্ত মিত্র দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে কেবল ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েই নয়, সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি সংকট ও অভিবাসন সমস্যা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ভুল নীতি অনুসরণ করছে। এই সমস্যাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না করা হলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইউরোপ তার ঐতিহ্যগত অবস্থান ও গুরুত্ব হারাবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্প ইউরোপের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে উইন্ড টারবাইনের অতিব্যবহারকে মহাদেশটির অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
অন্যদিকে ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইউক্রেন এই মুহূর্তে কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যোগদানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমেরিকার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা বা হাত নেই। ট্রাম্পের এই সামগ্রিক মূল্যায়ন এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মন্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে transatlantic বা আটলান্টিক-পারের দেশগুলোর মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।