আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লেবাননের কোনো ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে দখলের কোনো উদ্দেশ্য ইসরায়েলের নেই, তবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে এক মিলিমিটারও পিছু হটবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যেই সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের সামরিক কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের দিনই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি সম্পন্ন বক্তব্য সামনে এলো।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এই চুক্তির মূল শর্ত হলো লেবানন সরকার তার ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে সক্রিয় সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করবে এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। এই শর্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার পরই কেবল দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হবে। চুক্তির এই ধারাকে সমুন্নত রাখতে এবং হিজবুল্লাহর যেকোনো ধরনের পুনরুত্থান ঠেকাতে ইসরায়েল বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন কাটজ।
এদিকে লেবাননের সেনাপ্রধান জেনারেল জোসেফ আউন জানিয়েছেন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে এবং হিজবুল্লাহর প্রভাবমুক্ত করতে দেশটির সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েল সীমান্ত পর্যন্ত মোতায়েনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত রাতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একাধিক অবস্থান লক্ষ্য করে পুনরায় বিমান ও স্থল অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ওই এলাকায় অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হিজবুল্লাহর আকস্মিক হামলার জবাবেই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়। এই সংঘর্ষ ও একটি বিস্ফোরণের ঘটনায় আইডিএফের এক সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সামরিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ চলমান সামরিক পরিস্থিতি ও সেনা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বলেন, একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের দুটি নির্ধারিত কৌশলগত স্থান থেকে সাময়িকভাবে সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং সেখানে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে এই নির্ধারিত এলাকার বাইরে অন্য কোনো অঞ্চল থেকে এই মুহূর্তে সেনা সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ইসরায়েলের নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে কোন কোন এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে, তা নিয়ে তাড়াহুড়ো বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল তার সামরিক অবস্থান বজায় রাখবে এবং এই নীতিমালার প্রতি মার্কিন প্রশাসনও পূর্ণ সম্মতি জানিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী ও বর্তমান প্রশাসনের কৌশলগত ভূমিকার সমালোচনা ও প্রশংসা উভয়ই করেন। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ না থাকলে আইডিএফ লেবাননে হিজবুল্লাহর চিরতরে পতন ঘটাতে সক্ষম হতো। ইসরায়েলের একটি ব্যাপকভিত্তিক বিমান হামলার পরিকল্পনা ছিল, যা বাস্তবায়িত হলে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব মারাত্মক সংকটে পড়ত। তবে সেই সময়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় হিজবুল্লাহ ইরানের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছিল।
কাটজ আরও উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন-ইরান সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গে লেবানন ইস্যুকে যুক্ত করায় ইসরায়েলকে একপর্যায়ে বৈরুতে বিমান হামলা বন্ধ করতে হয়েছিল। এর আগে লেবাননের রাজধানীতে হিজবুল্লাহর প্রধান দফতরগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েল ব্যাপক ও বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত সংযোগের বিষয়টি ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনার জন্য কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও, ওয়াশিংটন ইরানের সাথে আলোচনার পথ সুগম করতে অত্যন্ত আগ্রহী থাকায় ইসরায়েল তা মেনে নেয়।
ইরানের সাথে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হামলা চালানোর চেষ্টা করে, তবে আইডিএফ তার কঠোর জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানে পাল্টা আঘাত হানার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুসমূহ ইতিমধ্যেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, ইসরায়েল তাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না, বরং নিজেদের প্রতিরক্ষায় স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখবে।