বিশেষ প্রতিবেদক
চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই এই সফরের মূল লক্ষ্য। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম কোনো বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ।
মঙ্গলবার চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর সফর ও কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী ২১ সদস্যের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধি দল নিয়ে চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। সেখানে চীন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডব্লিউইএফ আয়োজিত ‘সামার দাভোস ২০২৬’ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। এই ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’—এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া। এর মাধ্যমে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা প্রকাশ করছে।
সফরের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী ডব্লিউইএফের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক বিশেষ সেশনে বক্তব্য প্রদান করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উন্নীত করার নির্বাচনী অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বা জলবায়ু ক্ষতিপূরণ তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ু অর্থায়নকে বৈশ্বিক দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো সাধারণ ব্যয় নয়, বরং এটি মানবজাতির সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে এদিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে আয়োজিত এক নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, গিনি, মন্টিনিগ্রো এবং কাজাখস্তানের সরকারপ্রধানরাও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। এর আগে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট আলোইস জভিংগির সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।
পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে মুখপাত্র জানান, বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী ডব্লিউইএফের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অধিবেশনে যোগ দেবেন। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিতে তিনি হাই-স্পিড ট্রেনে দালিয়ান থেকে রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। বেইজিংয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক এই অর্থনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে ইতিবাচক বার্তা দেবে। একই সাথে চীনের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরিতে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।