বাংলাদেশ ডেস্ক
চীন সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলোইস জভিংগি। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় চীনের ডালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সাক্ষাতের শুরুতে ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশ্বিক বিভিন্ন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ডেল্টা বা বদ্বীপ রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকিতে থাকা উপকূলীয় দেশগুলোর অধিকার রক্ষায় জোর দাবি তোলেন। এসব দেশের টেকসই সুরক্ষায় ফোরামকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা নগণ্য হলেও, এর ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হচ্ছে তারা সবচেয়ে বেশি। তাই উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এখানে বড় দায়িত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজন সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টকে জানান, বর্তমান সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫০ মিলিয়ন (২৫ কোটি) বৃক্ষরোপণের একটি মেগা প্রকল্প ও বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ও বন্যার ঝুঁকি হ্রাস, পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন করার মেগা পরিকল্পনা ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ কর-সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) প্রদান করেছে। একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এই অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের এই উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং বড় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের সুষম বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং ফোরামের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
একই সঙ্গে আলোইস জভিংগি সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আগামী বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সাক্ষাতের ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হবে।