বিশেষ প্রতিবেদক
আগামী ২২ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকালে ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ২৫ জুন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিপক্ষীয় এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি রয়েছে।
শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর এই বহুমাত্রিক সফরের আনুষ্ঠানিক সূচি ও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এবারের বেইজিং সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ২৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।
পররাষ্ট্র সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শেষে আগামী ২২ জুন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর নগরী ডালিয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং ওই দিন সন্ধ্যায় সেখানে পৌঁছাবেন। পরদিন ২৩ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে তার বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এছাড়া ‘সামার দাভোস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা চলছে।
চীন সফরের প্রথম দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডব্লিউইএফ সম্মেলনে ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে ভাষণ দেবেন। ওই দিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।
আগামী ২৪ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রী ‘সামার দাভোস’-এর ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনযোগে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওউথাই স্টেট গেস্ট হাউস’-এ অবস্থান করবেন।
সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ২৫ জুন সকালে চীনের মিনিস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব সিপিসি সেন্ট্রাল কমিটি, বাণিজ্যমন্ত্রী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিআইডিসিএ) চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
একই দিন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সম্মেলনে তিনি চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ, ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানাবেন।
২৫ জুন বিকেলে চীনের ‘গ্রেট হল’-এ দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি দূরীকরণ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার বিষয়ে বিশদ আলোচনা হবে। আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কৃষি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্য খাতে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেবেন।
২৬ জুন সফরের শেষ দিনে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান (স্পিকার সমমর্যাদা) ঝাও লেজি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক একান্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। বেইজিংয়ের এই শীর্ষ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানাদিক ছাড়াও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে দুই নেতা আলোচনা করবেন।
সফরের অংশ হিসেবে ২৬ জুন বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওই দিন বিকেলেই বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে সন্ধ্যায় তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ বা সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এর ফলে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সচিব জানান, সরকার বিভিন্ন বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে। বাংলাদেশে চীনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান রয়েছে। সফরকালে চীনের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সূচি রয়েছে, যা দেশে চীনা বিনিয়োগের প্রবাহকে আরও গতিশীল করবে।