অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ যৌথভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ ৩৬টি ব্যাংক। আর্থিক সংকটে পড়া এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য খেলাপি ঋণের বড় ধাক্কা এড়াতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটেড পুনর্গঠন কাঠামো চূড়ান্ত করতে আজ রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সিটি গ্রুপের বিশাল অঙ্কের এই ঋণগুলো এখনও শ্রেণীকৃত বা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ঋণগুলোকে এখনই খেলাপি ঘোষণা না করে এই বিশেষ প্রস্তাবের আওতায় পুনর্গঠন করা হবে এবং গ্রুপটিকে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময়সীমা সুবিধা দেওয়া হবে। মূলত ব্যাংকিং খাতে একযোগে বড় ধরনের প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার চাপ এড়াতেই ব্যাংকগুলো যৌথভাবে এই সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আজকের বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপরই এই ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ভর করছে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত সিটি গ্রুপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এই শিল্পগোষ্ঠীটির বার্ষিক টার্নওভার বা আয়ের পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং এখানে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার কর্মী কর্মরত রয়েছেন। ফলে এই গ্রুপের ব্যবসায়িক স্থবিরতা সামগ্রিক বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সিটি গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গ্রুপটির পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদি সংশ্লিষ্ট ৩৬টি ব্যাংকই এই প্রস্তাবনায় একমত পোষণ করে, তবে তারা পর্ষদে বসার জন্য যৌথভাবে দুই থেকে তিনজন প্রতিনিধি মনোনীত করবে। এর মাধ্যমে গ্রুপের অর্থপ্রবাহ, ব্যয় এবং বিক্রির হিসাব কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত বৈশ্বিক ঋণ পুনর্গঠন মডেল এবং ‘ওয়াটারফল মেকানিজম’ অনুসরণ করে বাস্তবায়িত হবে। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, ৩৬টি ব্যাংকের যৌথ মালিকানায় একটি কেন্দ্রীয় ‘এসক্রো অ্যাকাউন্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত হিসাব খোলা হবে। সিটি গ্রুপের সমস্ত ব্যবসায়িক নগদ অর্থ বা ক্যাশ ফ্লো বাধ্যতামূলকভাবে প্রথমে এই অ্যাকাউন্টে জমা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি গ্রুপটি ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করে, তবে সেই অর্থ সরাসরি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসক্রো অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। এরপর সেখান থেকে শতকরা ৮০ ভাগ বা ৮০ টাকা সিটি গ্রুপকে তাদের দৈনিক পরিচালন ও চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) হিসেবে ফেরত দেওয়া হবে, যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়। আর অবশিষ্ট ২০ ভাগ বা ২০ টাকা ব্যাংকগুলোর পাওনা ঋণ পরিশোধের কিস্তি হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে রাখা হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের বিশেষ উদ্যোগে এই সংকট সমাধানের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবিত পুনর্গঠন ও সমাধান প্রক্রিয়ার প্রতি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছেন বলে জানা গেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের অন্যান্য বৃহৎ খেলাপি বা সংকটাপন্ন ঋণ আদায়ে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।