শীর্ষ সংবাদ ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক স্পট (খোলা) মার্কেট থেকে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই সংক্রান্ত দুটি পৃথক প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন সচল রাখতে এবং সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটার কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সাময়িক বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেটকে বেছে নিতে হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫-এর বিধি ১০৫(৩)(ক) অনুসরণে আন্তর্জাতিক কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে মোট তিন কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। তবে সার্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং দেশের অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের দিকটি বিবেচনা করে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আংশিক অনুমোদন দেয়। এর ফলে তিন কার্গোর পরিবর্তে আপাতত দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, তিন কার্গো এলএনজি ক্রয়ের মোট প্রস্তাবিত আর্থিক প্রাক্কলন ছিল ২ হাজার ১১২ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৪ টাকা (এআইটি বা অগ্রিম আয়কর-সহ)। তবে অনুমোদিত দুই কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন সূচক ও পূর্ববর্তী কয়েক মাসের গড় মূল্যের ভিত্তিতে এই জ্বালানির ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি খাতে একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সময়ে কিছু চালান যথাসময়ে দেশে পৌঁছাতে পারছে না।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তির বিশেষ ‘ফোর্স মেজর’ (অনাকাঙ্ক্ষিত বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে সৃষ্ট পরিস্থিতি) ধারা প্রয়োগ করছে। এর অর্থ হলো, চলমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সংকটের কারণে তারা পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে দেশের তাৎক্ষণিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে জুন মাস এবং জুলাইয়ের প্রথম দিকের জন্য দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ এলএনজি কার্গো ক্রয়ের পর তা সমুদ্রপথে দেশে পৌঁছাতে এবং বন্দরে খালাস করতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়।
প্রস্তাবিত তৃতীয় কার্গোটি বাতিলের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে এলএনজির দাম কিছুটা নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। ফলে দেশের বাজার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক দর আরও কয়েকদিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কোনো নিয়মিত চালান দেশে পৌঁছে যায় অথবা বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়, তবে স্পট মার্কেটের অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো সম্ভব হবে। সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের সর্বোচ্চ স্বার্থেই সরকার একটি কার্গোর ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরনীতি বা অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থার টেকসই নিরাপত্তা ও বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা সাময়িক এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।