অর্থনীতি প্রতিবেদক
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়েছে বৈশ্বিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। সংস্থাটি মনে করে, দেশের দীর্ঘদিনের দুর্বল রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে বাজেটের বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিচ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটের প্রধান পরীক্ষা হবে রাজস্ব সংগ্রহের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০.২ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তা হবে ১৯৯৩ সালের পর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত। এই বিশাল লক্ষ্য পূরণের জন্য সরকার বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে, যার বিপরীতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৯ শতাংশ। রাজস্বের এই বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য বাজেটে কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা, কর ছাড়ের পরিধি কমিয়ে আনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে অ-কর রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ফিচ সতর্ক করে বলেছে, অতীতেও এমন অনেক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে সরকারকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছে ফিচ। এবারের বাজেটে মোট ব্যয়ের ২৯.৭ শতাংশই বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য। এছাড়া দেশের ভৌত অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮.৭ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবেই বাজেট বাস্তবায়নে ও অর্থ ব্যয়ে এক ধরনের ধীরগতি থাকে। এই কম খরচের প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত সরকারের আর্থিক ঘাটতি বড় হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। অন্যদিকে দেশের জ্বালানি খাতের সংস্কার নিয়ে বাজেটে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ফিচ। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস-ভিত্তিক হওয়ায় এবারের বাজেটে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের পটভূমিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে।
আইএমএফের চলমান কর্মসূচিটি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হতে যাচ্ছে। ফিচ মনে করছে, বর্তমান বাস্তবতায় এই কর্মসূচির চূড়ান্ত পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং আইএমএফের সাথে নতুন কোনো সংস্কার এজেন্ডায় একমত হতে সরকারের কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে। ফলে নতুন অর্থবছরের বাজেটের ঋণমান ও ঋণ পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সরকার কতটা দক্ষতার সাথে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে পারছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছে তার ওপর। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের পূর্বাভাসের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে ফিচ রেটিংস। যেখানে সরকার আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ৬.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে, সেখানে ফিচের পূর্বাভাস বলছে এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩.৫ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের চলমান ভঙ্গুর দশা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি, নীতিগত কাঠামোর দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণেই প্রবৃদ্ধি এতটা কম হতে পারে বলে আশঙ্কা সংস্থাটির। তবে রাজস্ব ও ব্যয় উভয়ই কম হওয়ার পূর্বাভাসের কারণে সরকারের নির্ধারিত বাজেট ঘাটতি ৩.৬ শতাংশের মধ্যেই বজায় থাকবে বলে মনে করে ফিচ।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব আদায়ের সফলতা নির্ভর করছে সরকারের কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষমতার ওপর। সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যে, আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১১ শতাংশে উন্নীত করা হবে, মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ২.৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। এর মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে গতি আনতে এবং তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণে কর ছাড়, প্রণোদনা ও অবকাঠামো খাতের পিপিপি উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানোই এখন নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।