রাজধানী প্রতিবেদক
নাগরিক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের পারস্পরিক সমন্বয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর সমস্যাগুলোর তথ্যভিত্তিক ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ‘দক্ষিণের জানালা’ নামে একটি নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
আজ শনিবার রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে এই প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। উদ্বোধনী পর্ব শেষে ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা, নগর স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দুটি পৃথক কারিগরি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘দক্ষিণের জানালা’ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও জনসম্পৃক্ত নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগকে কেবল আলোচনা বা সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এখান থেকে প্রাপ্ত যৌক্তিক ও বাস্তবমুখী সুপারিশগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নীতিগত ও প্রশাসনিক সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি। মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য নাগরিকদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং এই প্ল্যাটফর্মটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ঢাকা দক্ষিণের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি বিদ্যমান নাগরিক সংকটগুলো চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই অঞ্চলটি বর্তমানে তীব্র যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, ত্রুটিপূর্ণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যা এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত অংশীদারিত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ‘দক্ষিণের জানালা’র মাধ্যমে খাতভিত্তিক সেমিনার, টাউন হল সভা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সহায়তায় একটি টেকসই উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হবে, যেখানে নাগরিকরা শুধু সেবাগ্রহীতা নন, বরং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে ‘নাগরিক ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারের প্রথম অধিবেশনে ‘ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা: বাস্তবতা ও করণীয়’ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ অংশে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসসিসির অঞ্চল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয়। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর নির্বাহী পরিচালক এস এম মাহবুবুর রহমান, সিইজিআইএস-এর নির্বাহী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন সরকার এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বিশেষজ্ঞরা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে ঢাকার প্রাকৃতিক জলাশয় পুনরুদ্ধার ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন।
সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘নগর স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসসিসির উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন। এই সেশনে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল এবং আইইডিসিআর-এর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রোজিনা আফরোজ।
আলোচকরা কেবল কীটনাশক প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশক নিধনের তাগিদ দেন। সেমিনারের উন্মুক্ত অধিবেশনে অংশীজনদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ডিএসসিসি প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি কর্মকর্তারা। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই প্ল্যাটফর্মটি ঢাকা দক্ষিণকে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক নগরীতে রূপান্তর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।