বিশেষ প্রতিবেদক
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আমদানি শেডে এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার (৫ জুন) রাতে বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো শেডের আমদানি অংশে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিমান ওঠানামা বা সার্বিক বিমান পরিচালনায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তবে কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং এতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনা তদন্তে ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে রাত ৩টার দিকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে যদি কারও কোনো ধরনের গাফিলতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কেপিআই (মূল চাবিকাঠি) স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনার কিছু কাঠামোগত ও নিয়মতান্ত্রিক ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, গত বছরের ১৮ অক্টোবর একই এলাকায় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার পর কার্গো ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও নিরাপদ করতে ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ধারণক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সাত দিনের মধ্যে আমদানি করা পণ্য ছাড় করার জন্য কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্ধারিত ধারণক্ষমতার সীমার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য কার্গো শেডে জমিয়ে রাখা হয়েছিল। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী ২০ টনের বেশি মালামাল থাকার কথা নয়, সেখানে প্রায় দেড়শ’ টনেরও বেশি পণ্য স্তূপাকারে রাখা হয়েছিল। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য এভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত রাখার পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা অংশীজনদের কোনো অবহেলা বা কায়েমি স্বার্থ ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং আগুনের মূল কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সংবাদ সম্মেলনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ এবং ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কোনো মহলের গাফিলতি বা নাশকতামূলক তৎপরতা এর পেছনে থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিমানবন্দর ও বেবিচক সূত্র জানায়, এই ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে তদন্তের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) পলিসি অ্যান্ড সার্টিফিকেশনের পরিচালক ইফতেখার জাহান হোসেনকে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে আরও বিস্তৃত এবং উচ্চতর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পণ্য আমদানি-রপ্তানি জোনের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সচলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।