বিশেষ প্রতিবেদক
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো বাংলাদেশের ছয়জন বীর শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর মর্যাদাপূর্ণ ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’ প্রদান করা হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরীর কাছে এই মেডেলগুলো হস্তান্তর করেন। বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরব ও নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে পুনর্মূল্যায়িত হয়েছে।
শনিবার ঢাকায় প্রাপ্ত এক সরকারি বার্তায় জানানো হয়, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো বিশ্বের ৩৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষীকে এই মেডেল প্রদান করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মহাসচিব বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিহত সকল শান্তিরক্ষীর স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশের ছয়জন বীর শান্তিরক্ষী হলেন— কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, প্রাইভেট মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্রাইভেট মো. সবুজ মিয়া, প্রাইভেট মো. মোমিনুল ইসলাম, প্রাইভেট শামীম রেজা এবং প্রাইভেট সান্তো মন্ডল। তারা সবাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে সুদানের কাদুগলির আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনীতে (ইউএনআইএসএফএ) কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে এক আকস্মিক ড্রোন হামলায় এই ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বর্তমানে নিয়োজিত ৫০ হাজারের বেশি শান্তিরক্ষীর অবদানের কথা গুরুত্বের সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিবেশেও শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক জনগণের জানমাল রক্ষা এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
পদক গ্রহণ শেষে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রক্ষিত শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং দেশের হয়ে আত্মোৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই পদক প্রাপ্তি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকারের স্বীকৃতি এবং দেশের সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম শীর্ষ সামরিক ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে সুপরিচিত। ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের বীরত্ব, মানবিকতা ও শৃঙ্খলা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুদানে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি ছয় সৈনিকের এই মর্মান্তিক নিহতের ঘটনা বহুজাতিক শান্তিরক্ষা মিশনের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকিকে নির্দেশ করে। এই মেডেল প্রাপ্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের অবদানের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আরও সুদৃঢ় হলো।