ধর্ম ডেস্ক
পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মুসলমান সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সমবেত হন। এই সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা কাবাগৃহ, হাজরে আসওয়াদ ও সাফা-মারওয়া পাহাড়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, মক্কা ও এর আশপাশের বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থান মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাস, নবী করিম (সা.)-এর নবুয়ত লাভ, হিজরত এবং হজের নানা বিধিবিধানের সঙ্গে এই স্থানগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের স্মৃতিবিজড়িত প্রধান ১২টি স্থানের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
হজের প্রধানতম রোকন বা স্তম্ভের সঙ্গে জড়িত ‘আরাফা ময়দান’, যা মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। ৯ জিলহজ এই ময়দানে অবস্থান করা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যাকে ‘উকুফে আরাফা’ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ময়দানেই তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। আরাফাত ময়দানের কাছেই অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মসজিদে নামিরা’। ৯ জিলহজ এই মসজিদে জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করা হয় এবং হজের মূল খুতবা প্রদান করা হয়। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় নির্মিত এই মসজিদটি সৌদি শাসনামলে ৩০০ মিলিয়ন রিয়াল ব্যয়ে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ১৮ হাজার বর্গমিটারে উন্নীত হয়েছে। আরাফাত ময়দানের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়, যেখানে দাঁড়িয়ে হাজিরা বিশেষভাবে ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনায় মগ্ন হন।
আরাফাত ও মিনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ‘মুজদালিফা’। ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে এসে এখানে মাগরিব ও ইশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন এবং রাত যাপন করেন। মুজদালিফায় রাত যাপন করা হজের একটি ওয়াজিব আমল এবং এখান থেকেই জামারায় নিক্ষেপের জন্য নুড়ি পাথর সংগ্রহ করা হয়। এরপরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো মক্কা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ‘মিনা প্রান্তর’। ১০ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত হাজিরা এখানে অবস্থান করেন বিধায় এটি ‘তাঁবুর শহর’ নামে পরিচিত। মিনায় অবস্থানকালে জামারায় পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি এবং তাশরিকের দিনগুলো পালন করা হয়। মিনাতেই অবস্থিত আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘মসজিদে খায়েফ’, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের সময় নামাজ আদায় করেছিলেন।
ইসলামের নবুয়ত ও হিজরতের ইতিহাসের সঙ্গে দুটি পাহাড় বিশেষভাবে জড়িত। মক্কা শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ‘জাবালে নুর’ বা আলোর পাহাড়, যার চূড়ায় অবস্থিত ‘গারে হেরা’ বা হেরা গুহায় ৪০ বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম ওহি লাভ করেন। অন্যদিকে, মক্কার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ‘জাবালে সাওর’। মদিনায় হিজরতের সময় মক্কার কুরাইশদের হাত থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং হজরত আবু বকর (রা.) এই পাহাড়ের গুহায় তিন দিন আত্মগোপন করেছিলেন। এই ঘটনাটি পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবায় উল্লেখ রয়েছে।
মক্কার অভ্যন্তরীণ ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে ‘মসজিদে জিন’ অন্যতম, যা জান্নাতুল মুয়াল্লা কবরস্থানের কাছে অবস্থিত। এখানে একদল জিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত শুনে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, যার বিবরণ কোরআনের সুরা জিনে রয়েছে। ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রায় ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদটি আধুনিকরূপে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এর অদূরেই রয়েছে ‘জান্নাতুল মুয়াল্লা’, যা মক্কার প্রাচীনতম কবরস্থান। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-সহ বহু সাহাবি ও তাবেঈনের সমাধি রয়েছে।
এছাড়া, মসজিদুল হারামের কাছে অবস্থিত ‘আবু কুবাইস পাহাড়’ মক্কার প্রাচীনতম পাহাড় হিসেবে খ্যাত, যেখান থেকে হজরত ইবরাহিম (আ.) মানবজাতিকে হজের আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে বর্ণিত রয়েছে। পরিশেষে, মক্কার তানিম এলাকায় অবস্থিত ‘মসজিদে আয়েশা’ একটি অন্যতম মিকাত স্থান। মক্কার অধিবাসী বা মক্কায় অবস্থানকারীরা ওমরাহ পালনের জন্য মূলত এই স্থান থেকে ইহরাম পরিধান করেন। হজ ও ওমরাহ পালনের পাশাপাশি এই স্থানগুলো পরিদর্শন মুসলিমদের হৃদয়ে ইসলামের গৌরবময় অতীত ও ত্যাগের ইতিহাস পুনরুজ্জীবিত করে।