বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে নতুন বিনিয়োগের গতি ত্বরান্বিত করতে এবং বেসরকারি খাতের বিকাশ সুগম করার লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্প খাতে দ্রুততর সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের (টিকে গ্রুপ) মধ্যে জমি লিজ প্রদান চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প, পাট ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান। নরসিংদীতে অবস্থিত বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের অতিরিক্ত জমি লিজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও পরিচালিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা দেখা যায় না। এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সার্বিক পরিচালন দক্ষতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গতিশীল। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করার নীতি গ্রহণ করেছে। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে বেগবান করা এবং একই সঙ্গে বেকারত্ব হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সরকারের মূল অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে বন্ধ মিলগুলো আবার সচল হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের উৎপাদন বন্ধ থাকা ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে ২০টিকে বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ১৪টি পাটকলের লিজ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি মিলে ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। সচল হওয়া এই মিলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বর্তমানে এসব মিল থেকে দৈনিক প্রায় ১৬০ মেট্রিক টন বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও ভূমিকা রাখছে।
নরসিংদীর বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের জমির ব্যবহার সংক্রান্ত অগ্রগতি উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই মিলের মোট ৭৭ দশমিক ২ একর জমির মধ্য থেকে পূর্বে ৩৪ দশমিক ৫০ একর জমি বাংলাদেশ জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয়েছিল। সেই জমিতে স্থাপিত কারখানায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং সেখানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কর্মকর্তা ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
চুক্তির নতুন পরিধি ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি আরও জানান, নতুন চুক্তি অনুযায়ী এবার প্রতিষ্ঠানটিকে অতিরিক্ত ১৪ দশমিক ৮০ একর জমি লিজ দেওয়া হলো। এই অতিরিক্ত জমিতে অবকাঠামো ও শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই বিনিয়োগের ফলে কারখানাটিতে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদিত হবে এবং নতুন করে আরও প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের অবদান রাখবে।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ সচিব ড. খায়রুজ্জামান চৌধুরী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট খাতের পুনরুজ্জীবনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের এই মডেলকে অত্যন্ত কার্যকর এবং দূরদর্শী বলে অভিহিত করেন।