রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি। দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনার জন্য সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে রুমিন ফারহানা এই বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি জানান, সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে বাণিজ্যমন্ত্রীর এক বৈঠকে এই চুক্তির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। ওই আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি, কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে নীতি সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, তার তুলনায় আমদানি তুলনামূলকভাবে কম। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের লক্ষ্যেই মূলত এই বাণিজ্য চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। তবে চুক্তির সময়কাল নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
তদানীন্তন সময়ে দেশের সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (থিংক ট্যাংক) পক্ষ থেকে দেওয়া আপত্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে এমন সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষজ্ঞরা তখন পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চুক্তির বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে চুক্তিটি সম্পন্ন করে।”
রুমিন ফারহানার দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত বা অনুচ্ছেদ (ক্লজ) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। বিশেষ করে আমদানির বাধ্যবাধকতা এবং নীতি সংস্কারের বিষয়গুলো দেশের স্থানীয় শিল্প ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান সরকার চাইলে জনস্বার্থে এই চুক্তিটি বাতিল বা সংশোধন করতে পারে বলে তিনি মত দেন এবং বিষয়টির স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার জন্য সংসদীয় কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। স্পিকার জানান, পয়েন্ট অব অর্ডার মূলত সংসদের চলমান কার্যক্রম বা শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং নীতিগত আলোচনার বিষয়, তাই এটি পয়েন্ট অব অর্ডারের আওতাভুক্ত নয়। স্পিকার তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, “আপনি বিধি অনুযায়ী যথাযথ নোটিশ প্রদান করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ বিবেচনা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশের সাথে যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চুক্তির শর্তাবলীতে স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন থাকা জরুরি। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের এই প্রস্তাবের ফলে চুক্তিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি ও জ্বালানি খাতের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে।