বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মধ্যে যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, তাদের নামের আগে ‘বীর’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাবনা পেশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। বুধবার (২৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম কার্যদিবসে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই প্রস্তাব দেন। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের অবদান তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বক্তব্যের শুরুতেই শামা ওবায়েদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “এই সংসদে আমরা যারা উপস্থিত আছি, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি না, বরং হৃদয়ে ধারণ করি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, পূর্ববর্তী দিনেও সংসদ অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর মনে হয়েছে যে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও সুনির্দিষ্ট সম্মান প্রদান করা উচিত।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে বলেন, “সংসদের ভেতরে যদি আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার শুরু করি, তবে এর প্রভাব সংসদের বাইরেও পড়বে। এতে করে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ বংশধররা আমাদের বীর সন্তানদের সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে।” তিনি আরও জানান, সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষেই এমন কয়েকজন সদস্য রয়েছেন যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে এই বিশেষ বিশেষণটি ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁদের অনন্য ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব।
শামা ওবায়েদের এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার সংসদের প্রচলিত নিয়ম ও সাম্প্রতিক কিছু আইনি পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। স্পিকার জানান, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং তা সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কেবল যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন, তাঁদেরই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য করা হবে। যুদ্ধের সময় অন্যান্যভাবে সহায়তা প্রদানকারীদের ‘মুক্তিযোদ্ধা সহায়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
সংসদীয় রীতিনীতির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে স্পিকার আরও বলেন, সাধারণত সংসদ অধিবেশনে সদস্যদের তাঁদের নিজ নিজ আসনভিত্তিক নির্বাচনী এলাকার পরিচয় দিয়ে সম্বোধন করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত অন্যান্য পরিচয় বা অর্জন অধিকাংশ ক্ষেত্রে উহ্য থাকে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে যারা নতুন সংজ্ঞার আলোকে প্রকৃত ও অস্ত্রধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাঁদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যের সত্যতা সাপেক্ষে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সম্বোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নথিপত্র এবং দাপ্তরিক সম্বোধনে ‘বীর’ শব্দটির ব্যবহার আগেই বাধ্যতামূলক করা হলেও সংসদীয় কার্যবিবরণীতে এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর এই প্রস্তাবটি যদি কার্যকর হয়, তবে তা জাতীয় সংসদের প্রথাগত সম্বোধন পদ্ধতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ সংসদের এই অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার বিষয়টি পুনরায় গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধাদের নামের পূর্বে ‘বীর’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, যা পরবর্তীতে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়। এখন সংসদীয় বিতর্কে এই প্রসঙ্গের উত্থাপন প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বোচ্চ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও পরিচিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে প্রাধান্য পাচ্ছে। অধিবেশনে উপস্থিত অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও এ সময় প্রতিমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্পিকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস আসায় ভবিষ্যতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে এ সংক্রান্ত কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।