নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে সশস্ত্র দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাত ১১টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বুধবার (২৯ এপ্রিল) উখিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্র এবং সীমান্ত পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানা গেছে, উখিয়ার বালুখালী বিওপির (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) দায়িত্বপূর্ণ এলাকার সীমান্ত পিলার-২০ থেকে আনুমানিক দেড় কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মিয়ানমারের ‘চাকমা কাটা’ নামক স্থানে এই সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। মিয়ানমারে সক্রিয় দুটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন—রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ)—এর সদস্যদের মধ্যে এই বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, সংঘর্ষ চলাকালীন অন্তত শতাধিক রাউন্ড গুলি ও ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ করা হয়। বুধবার ভোররাত পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় থেমে থেমে অস্থিরতা বিরাজ করেছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলা এই যুদ্ধের তীব্রতায় সীমান্তের এপারে থাকা বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে চরম উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। বিশেষ করে পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ও রহমতের বিল এলাকার বাসিন্দারা নির্ঘুম রাত কাটান। এলাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যরাতে হঠাৎ বিকট শব্দে গোলাগুলি শুরু হলে বসতবাড়ির কম্পন অনুভূত হয়। অনেক বাসিন্দা ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করেন। বালুখালী এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা। গোলার বিকট শব্দে শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকা থমথমে হয়ে যায়।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘাতের রেশ নিয়মিতভাবে এপারে এসে পড়ছে। মঙ্গলবারের ঘটনায় সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং অকারণে সীমান্তের জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি না যেতে বলা হয়েছে। এর আগেও মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি এপারে এসে পড়ার ঘটনা ঘটায় কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষরা তাদের নিয়মিত কাজে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি তাদের টহল ও নজরদারি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। উখিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা গোষ্ঠীগত সংঘাতের কারণে এপারে যেন কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে জওয়ানরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন। নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে বাড়তি লোকবল মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর লড়াই এবং পাশাপাশি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতা বাড়ছে। সীমান্ত এলাকায় চলমান এ সংঘর্ষের ফলে নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে বর্তমানে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে চলা মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত জনপদে এক দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্তে এ ধরনের অবিরাম সংঘর্ষ প্রতিবেশী দেশের সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসন বলছে, তারা আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সীমান্তের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বালুখালী ও পালংখালী সংলগ্ন এলাকায় বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে।