সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশে প্রচলিত আইনের পরিবর্তে কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইসলামি আইন প্রবর্তন এবং আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে একটি ‘ইসলামি বোর্ড’ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হওয়ায় রাষ্ট্রীয় আইনের প্রধান উৎস হওয়া উচিত আল-কোরআন। তিনি দাবি করেন, কোরআনের ৬৬৬৬টি আয়াতের মধ্যে প্রায় দুই হাজার আয়াতে বিধি-বিধান ও নিষেধের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। এ সময় তিনি দেশের সব মাযহাব ও মতাদর্শের ওলামায়ে কেরাম এবং মাদরাসা শিক্ষিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ বোর্ড গঠনের আহ্বান জানান, যারা ইসলামি আইন চালুর বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করবেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও পবিত্র কোরআনের কোনো বিধান আইন হিসেবে প্রবর্তন করা হয়নি। তিনি সূরা হজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আসীন হন, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশে নামাজ কায়েম করা এবং জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা। বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া ও চাঁদাবাজির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে ধর্মীয় অনুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। এসব অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি পুরনো বক্তব্যের সূত্র ধরে মুজিবুর রহমান বলেন, শরীয়তের আইনের বিষয়ে অতীতে ভিন্নমত থাকলেও বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো এর বিরোধিতা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোরআনের বিধান প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, মানুষের ইহকালীন কর্মকাণ্ডের চেয়ে পরকালীন মুক্তি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় পবিত্র কোরআনের বিধান অনুসরণ করা সময়ের দাবি।
বক্তব্য চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ—এই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। এছাড়া ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতের কোনো নেতা কখনোই এমন দাবি করেননি। তিনি সূরা তওবার উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন যে, জান্নাত প্রাপ্তি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বাসীদের জন্য একটি প্রতিশ্রুতি, যা আমল ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়। এটি কোনো বৈষয়িক লেনদেনের বিষয় নয়।
সংবিধান সংস্কার ও গণভোট সংক্রান্ত বিষয়েও তিনি তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট বা ভোটের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি জনপ্রতিনিধির নৈতিক দায়িত্ব। আইনি জটিলতা এড়াতে এবং জাতীয় সংকটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসনে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।