অর্থনীতি প্রতিবেদক
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঢালাওভাবে সব খাতে কর অব্যাহতি বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত পরামর্শক কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যেই মূলত এই সভার আয়োজন করা হয়।
দেশের বর্তমান আর্থিক সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দেনার বোঝা বর্তমান অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধের দায় সরকারের ওপর বর্তেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে পূর্বের তুলনায় অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বাজেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতিতে বিশ্বাসী। ব্যক্তিগত খাতের বিকাশই হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। সরকার কেবল সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কোনো বিশেষ রপ্তানি খাতের যদি তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বৈশ্বিক বাজারে বড় সম্ভাবনা থাকে, তবে সেই খাতকেও সমভাবে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে।
বাজেট ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত বছরগুলোতে বড় আকারের বাজেট প্রণয়নের যে প্রবণতা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ করেনি। বর্তমান সরকার কেবলমাত্র সংখ্যার বিচারে বড় বাজেট নয়, বরং গুণগত মানসম্পন্ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নে জোর দিচ্ছে। বড় প্রকল্পের আড়ালে জনঅর্থের অপচয় বা অনিয়ম রোধ করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বিগত আমলের ঋণ পরিশোধের চাপ সামলে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
উক্ত সভায় ব্যবসায়ী খাতের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আসন্ন বাজেটের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব পেশ করে। মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনটি ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের তুলনায় বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ জানায়। পাশাপাশি নারী করদাতাদের জন্য এই সীমা সাড়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন চেম্বার বডির প্রতিনিধি এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। তারা রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের এসকল প্রস্তাব গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন, তবে তা জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আসন্ন বাজেটে সরকার জনতুষ্টির চেয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উৎপাদনশীল খাতে সহায়তার দিকে বেশি মনোযোগী হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঘাটতি মোকাবিলা এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলানোই হবে আগামী অর্থবছরের প্রধান অর্থনৈতিক গতিপথ।