আইন আদালত ডেস্ক
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর পক্ষে পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
এদিন শুনানির শুরুতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। শুনানিতে ইনুর পক্ষে নিযুক্ত সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের আইনগত ও তথ্যগত অসারতা দাবি করে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। ডিফেন্স টিমের পক্ষে তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, প্রসিকিউশন পক্ষ যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে, তা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়নি। তারা মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনাবলীর সাথে আসামির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার এবং মামুনুর রশিদ। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়া অঞ্চলে যে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তাতে তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী অংশ হিসেবে হাসানুল হক ইনুর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। তারা গত কয়েকদিনের শুনানিতে প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে কুষ্টিয়া জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ছয়জন নিহত হন। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হাসানুল হক ইনুসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর আওতায় এই বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচার প্রক্রিয়াটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিচার চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং আদালত প্রাঙ্গণের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েও জনমনে গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
এদিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় আদালত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। বর্তমান বিচারিক ধারা অনুযায়ী, আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর প্রসিকিউশন পাল্টা যুক্তি খণ্ডনের সুযোগ পাবে। এরপর উভয় পক্ষের শুনানি পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য দিন চূড়ান্ত করবেন। এই মামলার রায় কুষ্টিয়া অঞ্চলের জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আদালত প্রাঙ্গণে আজ আইনজীবীদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। মামলার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে।