অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেড তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০২৫ হিসাব বছরের জন্য মোট ২১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত কোম্পানির ২৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের সর্বসম্মতিক্রমে এই লভ্যাংশ অনুমোদিত হয়।
ঘোষিত এই লভ্যাংশের আওতায় বিনিয়োগকারীরা প্রতি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে ২১.৫ টাকা করে নগদ অর্থ পাবেন। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এই লভ্যাংশের পরিমাণ গত বছরের কর-পরবর্তী মোট মুনাফার ৯৮.২ শতাংশ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা পরিপালন করে টানা কয়েক বছরের মতো এবারও ভার্চুয়ালি এই সাধারণ সভা আয়োজন করা হয়।
বার্ষিক সাধারণ সভায় গ্রামীণফোন বোর্ডের চেয়ারম্যান জন ওমুন্ড রেভহাগ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) অটো মাগনে রিসব্যাক এবং কোম্পানি সেক্রেটারি এস. এম. ইমদাদুল হকসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও গ্রামীণফোন ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা মোট আয় করেছে। আলোচিত বছর শেষে কোম্পানিটির মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখে, যার মধ্যে ৪ কোটি ৮৭ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন। তবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের মুখে কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণের পরেও কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান জন ওমুন্ড রেভহাগ তার বক্তব্যে বলেন, ২০২৫ সাল ছিল কোম্পানির জন্য একটি স্থিতিশীল অগ্রগতির বছর। তবে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামীণফোন মৌলিক সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই কোম্পানির মূল লক্ষ্য।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান ২০২৫ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে জানান, গ্রামীণফোন এখন একটি এআই-নির্ভর টেলকো-টেক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) নেটওয়ার্ক অপারেশন, গ্রাহক সেবা এবং পণ্যের পরিকল্পনায় একীভূত করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিভাগীয় শহরগুলোতে ফাইভজি (5G) সেবার সম্প্রসারণ এবং ‘মাইজিপি’ অ্যাপের মাধ্যমে ২ কোটি ২৫ লাখের বেশি গ্রাহককে ডিজিটাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘জিপি শিল্ড’ এবং বিনোদন প্ল্যাটফর্ম ‘বায়োস্কোপ+’ ও ‘ওয়ানগেম’ এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
দেশের অর্থনীতিতে গ্রামীণফোনের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত এক বছরে কোম্পানিটি কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাবদ জাতীয় কোষাগারে মোট ১২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। আধুনিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে গ্রামীণফোন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে সভায় জানানো হয়।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মুনাফার বড় একটি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা গ্রামীণফোনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো আগামীতে টেলিকম খাতের মুনাফার ধারাবাহিকতা রক্ষায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।